বিদেশি ঋণচাপে বাড়ছে সরকারি ব্যয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ১২ বার
বিদেশি ঋণচাপে বাড়ছে সরকারি ব্যয়

প্রকাশ: ২৫ মে   ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলেও বিদেশি ঋণ প্রবাহে ধীরগতি ও নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ ছাড় কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। একই সময়ে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি। বিপরীতে পুরোনো ঋণ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বেড়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ইআরডি’র তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা মোট ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় করেছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে লক্ষ্য পূরণের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৩ দশমিক ৮৪ শতাংশে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ ছাড় ছিল ৫ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে বছর ব্যবধানে ঋণ ছাড় কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা এই ঋণ ছাড় কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে বাস্তবায়ন ধীর হলে উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থ ছাড়ে সতর্কতা অবলম্বন করে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতিতেও বড় ধরনের পতন ঘটেছে। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত নতুন প্রতিশ্রুতি এসেছে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতি কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন কমে যাওয়া ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে। কারণ প্রতিশ্রুতি কমলে ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থের প্রবাহেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে ঋণ ছাড় ও প্রতিশ্রুতি কমলেও সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে ঋণ পরিশোধ। ইআরডির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধে সরকার ব্যয় করেছে ৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ বাড়তে থাকলে বাজেট ঘাটতির ওপর চাপ বাড়ে। বিশেষ করে যখন নতুন ঋণ আসার গতি কমে যায়, তখন রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও তীব্র হয়।

ইআরডি’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা আইডিএ। সংস্থাটি একাই ছাড় করেছে ৮৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার। এর পরেই রয়েছে রাশিয়া, যারা ছাড় করেছে ৮২ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যার ঋণ ছাড়ের পরিমাণ ৭১ কোটি ৬ লাখ ডলার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের ভূমিকা দেশের অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই প্রবাহকে প্রভাবিত করছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং পরিশোধের চাপ বাড়া—এই দুইয়ের সমন্বয় ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বড় প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ না হলে অর্থ ছাড় আরও কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, চলমান প্রকল্পগুলোতে অগ্রগতি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত করতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া, প্রতিশ্রুতি হ্রাস এবং পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধির এই তিনটি প্রবণতা বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং নতুন অর্থায়ন উৎস খোঁজার বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত