সায়েদাবাদে অবৈধ বাস কাউন্টারে বাড়ছে যানজট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
  • ৬৪ বার
সায়েদাবাদে অবৈধ বাস কাউন্টারে বাড়ছে যানজট

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ সায়েদাবাদ আবারও যেন ফিরে গেছে পুরোনো বিশৃঙ্খলার চিত্রে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে জোরালো অভিযান চালিয়ে শত শত অবৈধ ও অনুমোদনহীন বাস কাউন্টার উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেখানে এখন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই একই সমস্যা। রাস্তার দুই পাশে দখল করে বসানো হয়েছে কাউন্টার, যাত্রী ওঠানামা করছে মূল সড়কেই, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে পুরো রাজধানীর যান চলাচলে। বিশেষ করে ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে সায়েদাবাদ এলাকায় এখন সৃষ্টি হয়েছে চরম যানজট ও দুর্ভোগের পরিস্থিতি।

গত মাসে রাজধানীর টিটিপাড়া মোড় থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে অভিযান চালায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তখন বলা হয়েছিল, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যানজট কমানো এবং যাত্রীসেবা উন্নত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায় পুরো এলাকা। এখন সড়কের পাশে অবাধে চলছে টিকিট বিক্রি, বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো এবং কাউন্টারকেন্দ্রিক নানা বিশৃঙ্খলা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ভেতরে তুলনামূলক ফাঁকা পরিবেশ থাকলেও বাইরের সড়কগুলোতে তীব্র বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। রাস্তার পাশে সারি সারি কাউন্টার বসিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। কোনো কোনো বাস সড়কের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে যাত্রী নিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে পথচারীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে যাত্রা করা নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।

অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, টার্মিনালের প্রবেশপথও কৌশলে আংশিকভাবে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে ভেতরে গিয়ে টিকিট কেনা বা নিরাপদে বাসে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই বাইরের কাউন্টার থেকেই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে টিকিট কিনছেন। যাত্রীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে দোকান ভাড়া, সার্ভিস চার্জ কিংবা ঈদযাত্রার চাপের অজুহাতে জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে।

কুমিল্লাগামী যাত্রী নাসির উদ্দিন বলেন, পরিবার নিয়ে সায়েদাবাদে এসে বুঝতেই পারছি না কোথা দিয়ে হাঁটবো। চারদিকে বাস, কাউন্টার আর মানুষের ভিড়। শিশুদের নিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারলাম নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হবে, না হলে টিকিট পাওয়া যাবে না।

এক নারীযাত্রী জানান, টার্মিনালের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেও বাইরের লোকজন বারবার তাদের কাউন্টারে নিয়ে যেতে চেয়েছে। তিনি বলেন, মনে হয়েছে পুরো এলাকা যেন দালাল আর কাউন্টারকেন্দ্রিক একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে চলে গেছে। সাধারণ যাত্রীরা এখানে এসে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ছেন।

অবৈধ কাউন্টার ঘিরে পরিবহন মালিক সমিতির মধ্যেও তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্ব। পরিবহন মালিকদের একাংশ বলছেন, বাড়তি লাভের আশায় এবং দ্রুত যাত্রী তুলতে গিয়েই এসব কাউন্টার আবার চালু করা হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গ পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফ হোসেন বলেন, বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে বাইরে কাউন্টার নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখান থেকেই বাস ছাড়ানো হচ্ছে। এতে শুধু যানজটই বাড়ছে না, পুরো পরিবহন ব্যবস্থাও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, টার্মিনালের ভেতরে বাস পরিচালনা করলে একটি নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়, কিন্তু বাইরে থেকে পরিচালনা করলে কেউ সেই নিয়ম মানতে চায় না।

অন্যদিকে কাউন্টার ম্যানেজারদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাইরে কাউন্টার বসাতে হচ্ছে। এক কাউন্টার ম্যানেজার বলেন, ভেতরে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বাইরে থেকে যাত্রী তুললে দ্রুত বাস ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয়। যাত্রীরাও দ্রুত যেতে চান। এছাড়া টার্মিনালের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদযাত্রার বাড়তি চাপ বিবেচনায় সাময়িকভাবে কিছু কাউন্টার পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, সব কাউন্টার একসঙ্গে সরিয়ে টার্মিনালের ভেতরে নিয়ে গেলে ঈদের সময় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী জুন মাস পর্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য এই কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের সাময়িক সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। তাদের মতে, অবৈধ কাউন্টারকে সুযোগ দিলে তা ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নেয়। এতে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, রাজধানীর যানজটের অন্যতম বড় কারণ হলো সড়কের ওপর অনিয়ন্ত্রিত গণপরিবহন কার্যক্রম। বাসস্ট্যান্ডের বাইরে যাত্রী ওঠানামা, রাস্তার পাশে টিকিট বিক্রি এবং অবৈধ পার্কিং যানজটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

সায়েদাবাদ এলাকাবাসীরাও এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেশিরভাগ সময়ই এলাকায় তীব্র যানজট লেগে থাকে। অ্যাম্বুলেন্স কিংবা জরুরি যানবাহনও আটকে যাচ্ছে দীর্ঘ সময়। শব্দদূষণ, ধুলাবালি এবং মানুষের ভিড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িক উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। একইসঙ্গে টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে রাজধানীর গণপরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে।

ঈদকে কেন্দ্র করে এখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ছাড়ছেন। এই সময়ে সড়কে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু অবৈধ কাউন্টার ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে সেই চাপ আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে এবং নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com