সনদ সংকটে চামড়া রফতানির বিশাল সম্ভাবনা ঝুঁকিতে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
  • ৩৪ বার

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক মানের সনদের অভাবে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সম্ভাবনা আটকে আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এক দশক আগে যে খাতটি বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থানে ছিল, এখন সেই একই পরিমাণ রফতানি করেও আয় কমে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশ।

চামড়া খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মানসম্পন্ন সনদ না থাকা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। বিশেষ করে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত না হওয়ায় বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ।

এক সময় বাংলাদেশি চামড়া প্রতি স্কয়ারফুট ১.৫০ থেকে ১.৭০ ডলারে বিক্রি হতো। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে সেই দাম নেমে এসেছে মাত্র ০.৫০ থেকে ০.৭০ ডলারে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না দেশীয় ট্যানারিগুলো।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদ পাওয়া দেশগুলোর বাজার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে পোল্যান্ডভিত্তিক এলসি কোম্পানি এবং লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদপ্রাপ্ত ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের বহু প্রতিষ্ঠান এখন প্রতি স্কয়ারফুট চামড়া ১.৮০ থেকে ২.৫০ ডলারে বিক্রি করতে পারছে। এসব দেশে সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্বব্যাপী চামড়া বাজারের আকার প্রায় ৪২০ বিলিয়ন ডলার হলেও বাংলাদেশ সেখানে মাত্র ৩.৫ শতাংশ কাঁচা চামড়া সরবরাহ করেও আর্থিক অংশীদারিত্ব মাত্র ০.৭ শতাংশে সীমিত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত ভ্যালু অ্যাডিশনের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে না পারার ফল।

ট্যানারি মালিকরা অভিযোগ করছেন, সরকারের দীর্ঘদিনের নীতিগত উদাসীনতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই খাতটি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য দ্রুত এলডব্লিউজি সনদ অর্জন জরুরি।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, একসময় বাংলাদেশের চামড়া সরাসরি উন্নত মানের বাজারে রফতানি হতো এবং তখন প্রতি স্কয়ারফুটের দাম ছিল অনেক বেশি। তার মতে, যদি দেশের ২০ থেকে ২৫টি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পায়, তবে আবারও সেই উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ সম্ভব হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থা না থাকা। বিশেষ করে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত না হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, এই খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বেশি নয়, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল অত্যন্ত বড়। তিনি বলেন, সিইটিপি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে বাংলাদেশ বছরে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে। এটি বাস্তবায়ন হলে শুধু রফতানি আয় নয়, কর্মসংস্থান এবং শিল্পের বহুমুখীকরণেও বড় পরিবর্তন আসবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে চামড়া খাতে আর্থিক চাপ বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। তাই দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখনও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে না পারায় অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন হলে চামড়া শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত