সর্বশেষ :
মে মাসে বিজিবির অভিযানে ১৭৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ, সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার ৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে নতুন বিতর্ক, যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে আলোচনা যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বিএনপির প্রতিনিধি সমাবেশ অনুষ্ঠিত দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন, স্বস্তিতে ক্রেতারা বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: মত বিশ্লেষকদের ১৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত অনুমোদন, জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব ই-হেলথ কার্ডে রোগীর সব চিকিৎসা রেকর্ড এক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের ঋণ নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক শান্তিরক্ষায় ভবিষ্যৎ মিশন হবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর

যুক্তরাজ্যে পুলিশের অবহেলায় কিশোরের মৃত্যুতে তোলপাড়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৩৭ বার
যুক্তরাজ্যে পুলিশের অবহেলায় কিশোরের মৃত্যুতে তোলপাড়

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন শহরে গত বছরের ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রেশ এখনো কাটেনি, বরং ঘটনার আড়ালে থাকা পুলিশি অবহেলা ও বর্ণবাদী পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ১৮ বছর বয়সী কিশোর হেনরি নোভাকের মৃত্যুর ঘটনার প্রায় ছয় মাস পর নতুন করে সামনে আসা একটি ভিডিও ফুটেজ ব্রিটিশ সমাজ ও প্রশাসনকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গত সোমবার আদালত যখন হত্যাকারী বিক্রম দিগওয়াকে ন্যূনতম ২১ বছরের কারাদণ্ডসহ যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করে, তখনই এই ঘটনার নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও নোভাক পুলিশকে বারবার তার অবস্থার কথা জানাচ্ছিল, কিন্তু আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা উল্টো তাকেই হাতকড়া পরিয়ে ফেলে রেখেছিলেন। এই অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা ব্রিটিশ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

তদন্ত ও আদালতের নথিপত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় ২৩ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিক্রম দিগওয়া পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, শ্বেতাঙ্গ কিশোর হেনরি নোভাক তাকে বর্ণবাদী গালিগালাজ ও হামলার শিকার বানিয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই দিগওয়ার কথাকে পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নোভাকের ওপর চড়াও হন। অথচ নোভাক বারবার চিৎকার করে বলছিল যে, সে একজন হামলাকারীর ছুরিকাঘাতের শিকার এবং তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণে কাতর এক কিশোরের আর্তনাদ উপেক্ষা করে পুলিশ যখন তাকে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন হত্যাকারী দিগওয়া পাশেই নির্বিকার দাঁড়িয়ে ছিল। আদালত পরবর্তীতে রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, দিগওয়ার বর্ণবাদী হামলার দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্বয়ং এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, পুলিশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বর্ণবাদের অভিযোগ যেভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর গভীরে থাকা সত্য উন্মোচন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও দানা বেঁধেছে। মঙ্গলবার রাতে সাউদাম্পটনের পুলিশ স্টেশনের সামনে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীরা বারবার ‘আই ক্যান্ট ব্রিদ’ বা ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’ স্লোগান দিতে থাকেন, যা কয়েক বছর আগে আমেরিকায় পুলিশের নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর সেই করুণ আর্তনাদকে মনে করিয়ে দেয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ একপর্যায়ে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়, যেখানে পাথর, চেয়ার ও ফ্লেয়ার নিক্ষেপের মতো ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

নিহত হেনরি নোভাকের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, পুলিশ যদি ঘটনার সময় দিগওয়ার বর্ণবাদী মিথ্যার ফাঁদে না পড়ে নোভাককে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করত, তবে হয়তো আজ তাদের সন্তান বেঁচে থাকত। একজন ব্রিটিশ কিশোরের মৃত্যুর আগে পুলিশের এমন আচরণ কেবল অমানবিকই নয়, বরং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম উদাহরণ। সাউদাম্পটনের সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন, পুলিশের প্রাথমিক কর্তব্য হওয়া উচিত ছিল জীবন রক্ষা করা, অথচ তারা বেছে নিয়েছে বর্ণবাদী বয়ানের ভিত্তিতে বিচারকাজ পরিচালনা করা। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশ পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় পক্ষপাতিত্ব ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এখনো কতটা গভীরে শিকড় গেড়ে আছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা কোনো ব্যক্তির অভিযোগ শোনার সময় তার জাতিসত্তা বা গায়ের রঙের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন, তখন বিচার ব্যবস্থা তার নিরপেক্ষতা হারায়। নোভাক এবং দিগওয়ার ঘটনাটি সেই অশুভ ট্রেন্ডেরই বহিঃপ্রকাশ। দিগওয়া জানতেন যে, বর্ণবাদের কার্ড খেললে পুলিশ সরাসরি তার প্রতি সহমর্মী হবে এবং নোভাকের কথা শোনার আগেই তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করবে। এই সুযোগটিই হত্যাকারী ব্যবহার করেছে এবং নোভাককে হত্যা করার পর নিজে শিকার হওয়ার অভিনয় করে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে। আদালত শেষ পর্যন্ত সত্য উদঘাটন করলেও পুলিশের প্রাথমিক ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

সাউদাম্পটনের উত্তপ্ত রাস্তায় এখন দাঙ্গা পুলিশের সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, জনগণের আস্থা পুলিশ প্রশাসনের ওপর থেকে কতটা সরে গেছে। নাগরিক অধিকার রক্ষায় যারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তারাই যদি ভুক্তভোগীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে, তবে সাধারণ মানুষ কার কাছে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজবে? সরকারের উচিত এই ঘটনাকে একটি সাধারণ খুনের মামলা হিসেবে না দেখে পুলিশের ভেতরে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ নির্মূল করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তবে এই ক্ষোভ সমগ্র যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, নোভাক কেবল একটি প্রাণ নয়, বরং এটি ব্রিটিশ বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক ব্যর্থতার নাম। জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরের শেষ অনুরোধ উপেক্ষা করার কোনো নৈতিক অধিকার পুলিশের ছিল না। বিচার বিভাগ হত্যাকারীর সাজা নিশ্চিত করেছে ঠিকই, কিন্তু পুলিশের সেই রাতের কর্মকাণ্ডের বিচার কে করবে? সমাজ আশা করে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িত কর্মকর্তাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নোভাকের পরিবার শুধু তাদের সন্তানকে হারায়নি, তারা হেরেছে ন্যায়বিচারের ওপর থেকে বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার দায় এখন খোদ রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ওপর। আজকের এই উত্তাল সাউদাম্পটন যেন এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বর্ণবাদ ও পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষ আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার এবং তারা ন্যায়বিচার ছাড়া আর কোনো কিছুতেই থামতে নারাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত