সর্বশেষ :
মে মাসে বিজিবির অভিযানে ১৭৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ, সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার ৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে নতুন বিতর্ক, যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে আলোচনা যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বিএনপির প্রতিনিধি সমাবেশ অনুষ্ঠিত দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন, স্বস্তিতে ক্রেতারা বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: মত বিশ্লেষকদের ১৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত অনুমোদন, জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব ই-হেলথ কার্ডে রোগীর সব চিকিৎসা রেকর্ড এক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের ঋণ নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক শান্তিরক্ষায় ভবিষ্যৎ মিশন হবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর

৬০ দেশের পণ্যে মার্কিন নতুন শুল্কের প্রস্তাব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ১৫ বার
৬০ দেশের পণ্যে মার্কিন নতুন শুল্কের প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৩ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে এক বড় ধরনের অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের একটি নতুন প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর বা ইউএসটিআর-এর এই ঘোষণা বিশ্বব্যাপী উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, এই দেশগুলো তাদের শিল্পকারখানায় ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ফোর্সড লেবার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং মার্কিন শ্রমিকদের জন্য বৈশ্বিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতার একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। বাণিজ্য যুদ্ধের এই নতুন এই সমীকরণটি আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ইউএসটিআর-এর প্রস্তাবিত এই কাঠামো অনুযায়ী, ৬০টি দেশকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তালিকায় থাকা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, কানাডা, মেক্সিকো, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান এবং যুক্তরাজ্য উল্লেখযোগ্য। আর তালিকার বাকি ৪৫টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়েসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে অত্যন্ত কঠোর সুরে জানিয়েছেন যে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের অবাধ প্রবাহ কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, মার্কিন শ্রমিকরা যখন ন্যায্য মজুরি ও শ্রম আইন মেনে কাজ করেন, তখন বিদেশি কম মূল্যের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

এই নতুন শুল্ক প্রস্তাবের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো, এটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ববর্তী অনেকগুলো সাময়িক শুল্কের মেয়াদ আগামী ২৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জরুরি ক্ষমতার আওতায় আরোপিত একাধিক শুল্কের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সেগুলো বাতিল করেছিল। এখন সেই আইনি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এই শুল্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, এবারের পদক্ষেপটি কেবল একটি সাময়িক চাপের কৌশল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যনীতির অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা সিদ্ধান্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও-র নিয়মনীতির সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগের। ইউএসটিআর যদিও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে কম শুল্কে প্রবেশের একটি বিশেষ ব্যবস্থা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সেই ব্যবস্থার বিস্তারিত রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট। বস্ত্রশিল্পের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক মানেই হলো আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। এতে কেবল রপ্তানি আয় কমবে না, বরং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগকে তাই অনেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর এক ধরনের অদৃশ্য আঘাত হিসেবে দেখছেন।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও জটিল। উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে শিল্পায়নের পথ ধরে এগোচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা তাদের উন্নয়নযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। তবে মার্কিন প্রশাসন জোর দিয়ে বলছে যে, তারা শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের এই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নৈতিক অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভোট পাওয়ার একটি কৌশল থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এর ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা যে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রস্তাবিত এই শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে তা কেবল বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ভোক্তা পর্যায়েও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। যখন কোনো দেশ আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই খরচের দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই বর্তায়। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পোশাক ও বস্ত্রপণ্য যদি মার্কিন বাজারে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য দাবি করছে যে, তাদের নিজস্ব শিল্পকারখানাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়াই এই শুল্ক আরোপের মূল উদ্দেশ্য, যাতে করে ‘আমেরিকান মেড’ পণ্যের চাহিদা পুনরায় বৃদ্ধি পায়।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা। অতীতে যখনই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো কঠোর বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তখনই সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আলোচনার টেবিলে বসে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি সময়োপযোগী ও জরুরি হয়ে পড়েছে। শ্রম অধিকারের বিষয়গুলোতে যদি কোনো ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তা দ্রুত সংশোধন করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও শিল্পমালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এই শুল্কের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও খোলা রাখতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশই বিচ্ছিন্নভাবে সফল হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব রাখে, কিন্তু তার সিদ্ধান্তগুলো যেন অন্য দেশের অর্থনীতির ওপর কোনো ধরনের বিপর্যয় ডেকে না আনে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। জোরপূর্বক শ্রম বা মানবাধিকারের প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যেন রাজনৈতিক স্বার্থে বা শুল্ক যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলো তাদের শ্রমমানের উন্নয়নে গত কয়েক বছরে অনেক অগ্রগতি সাধন করেছে, যা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। সামনের দিনগুলোতে মার্কিন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ। একটি বাংলাদেশ অনলাইন আশা করে যে, আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসন হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত