প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পূর্ব ইউরোপের আকাশ এখন কেবল ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে ভারী। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন এক নতুন এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। যুদ্ধের তৃতীয় বছরে এসে দুই পক্ষই যেন একে অপরকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বুধবার (৩ জুন) থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার চিত্র বলছে, যুদ্ধের ময়দান এখন আর কেবল ফ্রন্টলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ড্রোন থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র—সবই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে বেসামরিক স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির ওপর। এই সংঘাত এখন কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, বরং এটি অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো রাশিয়ার গভীরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বিশ্বকে হতবাক করেছে। সীমান্ত থেকে প্রায় ১১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল এবং নৌঘাঁটিতে আঘাত হানার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইউক্রেনের ড্রোন প্রযুক্তি এবং আক্রমণের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘটনাটি রুশ নিরাপত্তার ওপর একটি বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় আটজন সাধারণ মানুষের করুণ মৃত্যু আবারও যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক দিকটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি যাত্রীবাহী বাসে ড্রোন হামলার সেই দৃশ্য আধুনিক যুদ্ধের নির্মমতাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের জানমালের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়েই পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই নতুন আক্রমণের জোয়ারকে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক ‘ন্যায্য প্রতিশোধ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মস্কোর প্রতিটি হামলার কড়া জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের হুংকার, ‘পদ্ধতিগত এবং কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত মঙ্গলবার ইউক্রেনজুড়ে মস্কো যে রেকর্ড ৬০০টিরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, তা কোনো সাধারণ সামরিক অভিযান ছিল না; বরং এটি ছিল প্রতিপক্ষের অবকাঠামো এবং মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। বুধবার দিনভর শতাধিক সম্মুখ লড়াইয়ের সংবাদ নিশ্চিত করছে যে, যুদ্ধের ময়দানে কোনো পক্ষই এক চুল ছাড় দিতে নারাজ।
যুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই ইউরোপীয় পরাশক্তিদের মধ্যে শান্তি আলোচনার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। জার্মানি, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স—যারা ‘ই-থ্রি’ নামে পরিচিত—এই তিন দেশ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার টেবিলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইউরোপের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। জার্মানির উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে যে, শান্তি আলোচনার এই সম্ভাবনা কেবল রাশিয়ার ওপর চাপের কারণে নয়, বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পেতেও জরুরি। তবে যুদ্ধের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে আলোচনার পথ কতটা সুগম হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ এখন কেবল বেঁচে থাকার লড়াই করছে। একদিকে আকাশ থেকে নেমে আসা রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্ক, অন্যদিকে ড্রোন হামলার ধ্বংসলীলা—সব মিলিয়ে তারা এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়ার সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। নিত্যপণ্যের দাম, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং স্বজন হারানোর বেদনা দেশটিতে এক অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুদ্ধের ময়দানে যারা প্রাণ হারাচ্ছেন, তারা সবাই কোনো না কোনো পরিবারের স্বপ্ন ছিলেন। এই সংঘাত কেবল মানচিত্রের সীমানা পরিবর্তন করছে না, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে বেড়ানোর মতো এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই পক্ষই এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে কোনো পক্ষই হার স্বীকার করতে চায় না। জেলেনস্কি যেমন তার দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন, তেমনি পুতিনও তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে মরিয়া। কিন্তু এই লড়াইয়ের কোনো শেষ কি আসলেই আছে? রাশিয়ার ওপর ইউরোপের চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টায় সমুদ্রসীমাতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি আন্তর্জাতিক করে তুলছে। এই সংঘাতের প্রভাবে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার অভাব এখন কেবল ইউক্রেনে নয়, বরং বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশেই অনুভূত হচ্ছে।
শান্তি আলোচনার যে সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে, তা হয়তো এখনো শৈশবে আছে। তবে ই-থ্রি জোটের এই উদ্যোগই কি পারে কোটি কোটি মানুষের জীবনের আশা জাগাতে? ইতিহাস সাক্ষী, বড় বড় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিল দিয়েই শেষ হয়। কিন্তু সেই টেবিলে পৌঁছানোর আগে আর কত রক্ত ঝরবে, আর কত জনপদ ধ্বংস হবে—সেই প্রশ্ন এখন বিশ্ব বিবেককে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ইউক্রেন এবং রাশিয়া উভয় দেশই এখন এমন একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভুল পদক্ষেপ কেবল ধ্বংসের গহ্বরকেই বড় করবে। এখন সময়ের দাবি হলো, সংঘাতের পরিবর্তে কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার দম্ভ আর প্রতিশোধের আগুন যখন তুঙ্গে থাকে, তখন শান্তির বাণী কেবলই অরণ্যে রোদনের মতো শোনায়।
পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধ কেবল রাশিয়া বা ইউক্রেনের নয়, এটি বর্তমান বিশ্বের এক বিশাল বিপর্যয়। মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় যে মাত্রায় বাড়ছে, তা আগামী কয়েক দশকেও পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় দ্রুত একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি অর্জিত হবে। কারণ ধ্বংসের এই উৎসব আর দীর্ঘায়িত হলে, কেবল দুই দেশই নয়, গোটা মানবজাতি এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। শান্তির সুবাতাস কবে বইবে, তা কেবল সময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতৃত্বের ওপরই নির্ভর করছে।