ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা: চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে কর্মবিরতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৯ বার
ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা: চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে কর্মবিরতি

প্রকাশ: ৪ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে এখন অস্থিরতার কালো ছায়া। ব্যাংকটির সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ব্যাংকের অন্দরমহল ও রাজপথ। টানা চতুর্থ দিনের মতো অব্যাহত এই আন্দোলনে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগ দিয়েছেন। সচেতন গ্রাহক ফোরামের ডাকে সাড়া দিয়ে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শাখায় এই কর্মসূচি পালিত হওয়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে, যা আমানতকারী ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

গত ২৪ মে অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়োগের পর থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার এবং ব্যাংকের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি, ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি ব্যাংকের সংস্কৃতি ও গ্রাহকের আস্থার জায়গাটি বোঝেন। খুরশীদ আলমের নিয়োগকে তারা মানতে নারাজ। আন্দোলনের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বুধবার আন্দোলনরতরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে প্রতীকী কর্মবিরতি পালনের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ তার প্রতিফলন দেখা গেছে ব্যাংকটির কার্যক্রমের স্থবিরতায়।

ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন ব্যাংকের আর্থিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। ব্যাংকটির এমডি ওমর ফারুক খান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তা গ্রহণ করেছে। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত আলতাফ হোসাইনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে শীর্ষ পর্যায়ে এই রদবদল আন্দোলনরত কর্মকর্তাদের শান্ত করতে পারেনি। তাদের মূল দাবি একটিই—চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল এবং পদত্যাগ। এই আন্দোলনের পেছনের জনমত এখন এতটাই শক্তিশালী যে, তা উপেক্ষা করা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

আন্দোলনরত কর্মকর্তারা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা ও ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তারা মনে করেন, ভুল নেতৃত্বের কারণে দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থার জায়গাটি ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। রাজপথের বিক্ষোভ ও ব্যাংকের ভেতরের প্রতীকী কর্মবিরতি—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মধ্যে এই টানাপোড়েনের কারণে লেনদেনে বিলম্ব হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান এবং ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় সচেষ্ট। তবে এই সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও প্রকট হতে পারে। ব্যাংকের গ্রাহক ফোরামের নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের যৌক্তিক দাবি না মানা হবে, ততক্ষণ তারা ঘরে ফিরে যাবেন না। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে প্রতিদিন যে দীর্ঘ লাইন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে, তা ব্যাংকিং ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।

মানবিক দিক থেকে দেখলে, ব্যাংকের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী আজ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তাদের ক্যারিয়ার, পরিবারের নিরাপত্তা এবং একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের মান-মর্যাদা রক্ষার তাগিদে তারা যে পথে নেমেছেন, তা তাদের পেশাদারিত্বের প্রতি দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। তাদের চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে, তারা কেবল নিজেদের বেতন বা চাকরির জন্য নয়, বরং এই ব্যাংকের সুনাম রক্ষার জন্যই এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে, গ্রাহকরা তাদের জমানো টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। ব্যাংক খোলা থাকলেও স্বাভাবিক লেনদেনে বাধা আসার ফলে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সুষ্ঠু সংলাপ।

পরিচালনা পর্ষদের উচিত আন্দোলনকারীদের দাবিগুলোকে গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা। যদি খুরশীদ আলমের নিয়োগ নিয়ে সত্যিই কোনো বিতর্ক থাকে, তবে তা আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা সম্ভব। জোর করে কাউকে পদে বসিয়ে রাখা বা আন্দোলন দমন করে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না। ইসলামী ব্যাংকের বিশাল আমানতকারী গোষ্ঠীর স্বার্থে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা। যদি দ্রুততম সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না আসে, তবে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্য সংকট বাড়তে পারে, যা দেশের পুরো আর্থিক খাতকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি ব্যাংক নয়, এটি দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভরসার জায়গা। এখানকার অস্থিরতা মানেই দেশের অর্থনীতির অস্থিরতা। আজ যে এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হলো, তা আসলে কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই বার্তার ভাষা বুঝতে ভুল করলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা দ্রুত পরিস্থিতি অনুধাবন করবেন এবং ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। মানুষের বিশ্বাসই যদি নড়ে যায়, তবে কোনো ব্যাংকই টিকে থাকতে পারে না। তাই আজ প্রয়োজন সমঝোতা, প্রয়োজন স্বচ্ছতা এবং প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল নেতৃত্ব, যা সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত