প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ-বাতাস গত কয়েক মাস ধরে যে যুদ্ধের আতঙ্কে থমথমে ছিল, অবশেষে সেই উত্তেজনা প্রশমনের একটি বড় ইঙ্গিত পাওয়া গেল ওয়াশিংটন থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার (৩ জুন) মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শুনানিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এই ঘোষণাটি এমন এক সময় এল যখন বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে ইরান-মার্কিন সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং জ্বালানি সরবরাহসহ বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। রুবিওর এই বক্তব্যে শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসীর জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কংগ্রেসের শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে রুবিও তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিযানের ফলাফল এবং পরবর্তী পদক্ষেপের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মার্কিন বাহিনী তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা এবং ড্রোনের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। রুবিওর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, ওয়াশিংটন কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পথে হাঁটতে চায় না, বরং সামরিক চাপে ইরানকে তাদের অবস্থানে নমনীয় করতে চেয়েছিল।
তবে রুবিও তার বক্তৃতায় ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে সেটি কী রূপ নেবে, তা নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে যদি কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াও হয়, তবে তা আর চলমান কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানের অংশ হবে না; বরং তা কেবল আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হবে। এই বার্তাটি তেহরানের জন্য একটি স্পষ্ট সিগন্যাল যে, ওয়াশিংটন এখন সামরিক অভিযানের পথ থেকে সরে এসে কূটনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানে মনোনিবেশ করতে চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণায় মার্কিন প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় দিক থেকেই যে চাপের সৃষ্টি হয়েছিল, তার কিছুটা প্রশমন ঘটতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ইরান-মার্কিন সংঘাতের এই অধ্যায় বিশ্ববাসীর জন্য ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কেবল ওই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এক বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা এবং সামরিক মহড়ার ফলে জাহাজ চলাচলের যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। এখন অভিযান সমাপ্তির ঘোষণায় আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে যেতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা মানেই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান নয়; বরং উভয় পক্ষকে এখন দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও আলোচনার টেবিলে বসার জন্য নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।
এই সামরিক অভিযানের সমাপ্তি কেবল একটি কৌশলগত সমাপ্তি নয়, বরং এটি অনেক মানবিক সংকটের ইতি টানারও সুযোগ। যুদ্ধের সময় যে পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, তা কোনো রাষ্ট্রের জন্যই সুখকর নয়। সাধারণ মানুষের জীবন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী। রুবিওর ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এক ধরনের আশার আলো দেখাচ্ছে যে, কূটনীতি এখন সামরিক শক্তির চেয়ে বেশি কার্যকর হবে। বিশ্বজুড়ে মানুষ আশা করছে, শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে উভয় পক্ষই এখন থেকে আরও বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করবে।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর তেহরান থেকে কোনো চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও, এটি নিশ্চিত যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ইরান যুদ্ধ থামাতে যে প্রস্তাব পাস হয়েছিল এবং প্রশাসনের ওপর যে প্রবল রাজনৈতিক চাপ ছিল, তা উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর থাকা সেই চাপের কারণেই হয়তো এখন এই কৌশলগত পিছু হটা। এটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক অভূতপূর্ব সমন্বয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে শান্তির এই বাতাবরণ কতটুকু স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আস্থা একটি বিরল পণ্য। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে গেলে কেবল সামরিক অভিযান সমাপ্তির ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, বরং এর চেয়েও বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতা, তা নিরসনে এই সামরিক অভিযান সমাপ্তি একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে। বিশ্ববাসী এখন অপেক্ষা করছে একটি স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের, যেখানে যুদ্ধের দামামা নয়, বরং অর্থনীতির বিকাশের জয়গান শোনা যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, অপারেশন এপিক ফিউরির সমাপ্তি বিশ্বশান্তির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। রুবিওর বক্তব্য থেকে আমরা একটি নতুন মার্কিন নীতি দেখতে পাচ্ছি, যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত শান্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে উৎসাহিত করা। মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়িত্ব এখন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আশা করি, আলোচনার পথেই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান আসবে, যা বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ করবে।