প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি অভাবনীয় পদক্ষেপ নিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই ভয়াবহ সংঘাতের যবনিকা টানতে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে পাঠিয়েছেন এক খোলা চিঠি। চিঠির ভাষা যেমন ছিল কঠোর ও দৃঢ়, তেমনি সেখানে ফুটে উঠেছে শান্তির জন্য ব্যাকুল এক রাষ্ট্রপ্রধানের হৃদয়ের আর্তনাদ। জেলেনস্কি সরাসরি পুতিনকে মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন এবং এই আলোচনা সফল করার লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, বরং এর প্রতিটি দিন ইউক্রেনের মানুষের জন্য বয়ে এনেছে অপূরণীয় ক্ষতি এবং অশেষ বেদনা।
জেলেনস্কির এই চিঠিতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তার পাশাপাশি ছিল স্পষ্ট বাস্তবতা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইউরোপের এই যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ এখন ভিন্ন দিকে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরান ইস্যুসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত। জেলেনস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও কবে ইউরোপের যুদ্ধের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেবে, সেই অপেক্ষায় বসে থাকাটা ইউক্রেনের জন্য ভুল হবে। যুদ্ধের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। তাই নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য তিনি নিজে থেকেই রাশিয়ার সাথে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার এই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
চিঠির ভাষা ও উপস্থাপন ছিল অত্যন্ত সাহসী। এতে জেলেনস্কি সাম্প্রতিক সময়ে রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের হামলার প্রসঙ্গ টেনে কিছুটা শ্লেষ ও ব্যঙ্গাত্মক সুর ব্যবহার করেছেন। তিনি লিখেছেন, ২৬ বছর ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকা পুতিনের ওপর বয়সের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এই ব্যক্তিগত আক্রমণের সুর দিয়ে তিনি মূলত যুদ্ধের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তবে এই উত্তপ্ত ভাষার আড়ালে ছিল একটি বড় প্রশ্ন—যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ী কে হবে? ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা কোনোভাবেই দমে যাওয়ার পাত্র নয়। বরং চরম পরিস্থিতিতেও তারা শত্রুর ঘরে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
অন্যদিকে, পুতিন তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। ক্রেমলিন থেকে জানানো হয়েছে, তারা জেলেনস্কির চিঠি পেয়েছে এবং পুতিনকে এই বিষয়ে অবহিত করা হবে। ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, জেলেনস্কি যদি আলোচনার জন্য আগ্রহী হন, তবে তাকে মস্কোতে এসে বৈঠকের কথা ভাবতে হবে। পুতিনের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের ওপর শর্ত আরোপের প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেনকে তাদের দখলে থাকা চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল—দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের স্বপ্ন পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হবে। এই দাবিগুলো ইউক্রেনের জন্য কার্যত অগ্রহণযোগ্য, কারণ তাদের মতে, এই অঞ্চলগুলো ছেড়ে দেওয়া মানে ভবিষ্যতে রাশিয়ার আরও বড় আগ্রাসনের পথ প্রশস্ত করা। তারা ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের ঘটনার স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এই শর্তের তীব্র বিরোধী।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জেলেনস্কি ও পুতিনের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হলে তা বিশ্বশান্তির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক এবং চমৎকার একটি উদ্যোগ হবে। কিন্তু কূটনীতির এই গোলকধাঁধায় বাস্তবতা ভিন্ন। এর আগে জেনেভা, আবুধাবি এবং ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনাগুলো কার্যত কোনো ফলপ্রসূ ফলাফল দিতে পারেনি। প্রতিটি আলোচনার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে এবং অস্ত্রের গর্জন বেড়েছে। ইউক্রেনের মানুষের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত এখন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে। জেলেনস্কি চিঠির শেষাংশে অত্যন্ত মানবিক সুরে লিখেছেন, রুশ সেনাদের ভাগ্য বা তাদের রণকৌশল নিয়ে তিনি চিন্তিত নন, তার সমস্ত চিন্তা এখন ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ ও তাদের সন্তানদের নিয়ে। অগণিত মানুষের মৃত্যু আর ঘরবাড়ি ধ্বংসের যে মিছিল তার দেশে চলছে, তা তাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আহত করেছে।
যুদ্ধের এই দীর্ঘ পথ চলায় শান্তি এখন একটি দুষ্প্রাপ্য বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষেরই দাবি এবং পাল্টাদাবি যুদ্ধের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করছে। জেলেনস্কির এই খোলা চিঠিটি কি যুদ্ধের ময়দানে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসবে, নাকি এটি কেবলই ইতিহাসের পাতায় আরও একটি ব্যর্থ আলোচনার নজির হয়ে থাকবে? তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, জেলেনস্কির এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি শান্তি যে আবেদন জানিয়েছেন, তা আজ কেবল তার দেশের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বিশ্ব এখন কেবল চেয়ে দেখছে, এই দুই নেতার দ্বন্দ্ব কি সমঝোতার পথে গড়াবে, নাকি আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাবে পৃথিবী। মানবিক বিপর্যয়ের এই যুগে আলোচনার টেবিলেই লুকিয়ে আছে সমাধানের চাবিকাঠি, তবে সেই চাবিকাঠি ব্যবহারের মানসিকতা পুতিন ও জেলেনস্কি উভয়ই দেখাতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।