সর্বশেষ :
লালমনিরহাট সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, বিজিবির কঠোর অবস্থান দরুদ পাঠের বিশেষ পাঁচটি সময়: পুণ্যের অনন্য সুযোগ তীব্র গরমে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া: প্রতিকারের ঘরোয়া উপায় দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: প্রাণ হারালেন কুমিল্লার নূরুল আমিন নাইট উপাধিতে ভূষিত ইদ্রিস এলবা: মানবিক কাজের অনন্য স্বীকৃতি হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল ঢাবি: ইনকিলাব মঞ্চের মশালমিছিল লেবাননে হামলা বন্ধের ডাক আইআরজিসির ভূরুঙ্গামারীতে অগ্নিকাণ্ড: ভস্মীভূত ৫০ দোকান, পথে ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাজারে ফেরার ইঙ্গিত: বড় উত্থানে সপ্তাহের লেনদেন উত্তর কোরিয়া সফরে শি জিনপিং: কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

দৌলতদিয়ায় আবারও পদ্মা গ্রাস করল যাত্রীবাহী বাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৮ বার
দৌলতদিয়ায় আবারও পদ্মা গ্রাস করল যাত্রীবাহী বাস

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের পারাপারের প্রধান মাধ্যম দৌলতদিয়া ফেরিঘাট আজ আবারও এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পদ্মা নদীর উত্তাল গর্ভে তলিয়ে গেল কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। ঘাটের ৭ নম্বর পন্টুনে যখন এই দুর্ঘটনা ঘটে, তখন চারপাশে ছিল ব্যস্ততার আমেজ। হঠাৎ বিকট শব্দে পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি নদীতে পড়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ এবং যান্ত্রিক ত্রুটির ভয়াবহতা ফেরিঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। সৌভাগ্যবশত, এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও দুর্ঘটনার আকস্মিকতা সকলকে শিহরিত করেছে।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকারী দল তৎপর হয়ে ওঠে। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানিয়েছেন, বাসটিতে তখন কেবল চালক ও তার সহকারী ছিলেন। স্থানীয় মানুষ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টায় তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে ঘটনার আকস্মিকতায় তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি নিজে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে উদ্ধারকাজের সার্বিক দিক তদারকি করছেন। পন্টুনে থাকা অন্যান্য যানবাহন ও যাত্রীদের মধ্যে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়, বরং এটি যেন এক নিয়মিত অভিশাপে পরিণত হয়েছে। গত ২৫ মার্চ ঠিক একই রকম একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল এই ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুনে। সেবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২৬ জন যাত্রীর করুণ মৃত্যু হয়েছিল, যা সমগ্র জাতিকে শোকের সাগরে ভাসিয়েছিল। সেই শোকের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও একই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন বারবার একই ঘাটে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে।

পদ্মা নদীর তীব্র স্রোত এবং ফেরিঘাটের পন্টুনগুলোর নাজুক অবস্থার কথা বারবার উঠে এলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়া বা দূরপাল্লার বাসগুলোর চালকদের এই ঘাটে ওঠানামার ক্ষেত্রে যে ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফেরির পন্টুনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী বা জরুরি ব্রেকিং সিস্টেমের অভাব কি এই ধরনের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী? কিংবা পন্টুনের নড়বড়ে অবস্থা কি চালকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে বাসগুলোকে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। যাত্রী সুরক্ষায় ফেরিঘাটগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কেবল বাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তবে প্রয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়।

মানবিক দিক থেকে দেখলে, এই ধরনের দুর্ঘটনা কেবল একটি যান্ত্রিক বিপর্যয় নয়, এটি প্রতিটি পরিবারের জন্য এক বড় মানসিক ট্রমা। যখন একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যায়, তখন সেই গাড়িতে থাকা প্রতিটি যাত্রী বা কর্মীর জীবনের ঝুঁকি থাকে। সৌভাগ্যবশত আজ বড় কোনো প্রাণহানি হয়নি, কিন্তু সবসময় ভাগ্য সহায় নাও হতে পারে। ২৬ জন মানুষের মৃত্যুর সেই স্মৃতি এখনো তাজা হয়ে আছে অনেকের মনে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। দৌলতদিয়ার মানুষের কাছে এই ফেরিঘাটটি জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই এখানে প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

এখন সময় এসেছে প্রশাসনিক কঠোরতা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের। ঘাটে ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা, পন্টুনগুলোর সক্ষমতা যাচাই এবং চালকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ডুবুরি দলের সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি এবং প্রতিটি পন্টুনে আধুনিক সিগন্যাল ও নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকা আবশ্যক। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে নৌ-পথের নিরাপত্তা আমাদের উন্নয়নেরই একটি অংশ। যদি আমরা যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ কোনোদিনই ভোগ করতে পারবে না। দৌলতদিয়ার এই পুনরায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা আমাদের সচেতনতার অভাব ও দায়বদ্ধতার জায়গাটিকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। আশা করি, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবার আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন আতঙ্কজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনোই না ঘটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত