নেতানিয়াহু: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৪৯ বার
নেতানিয়াহু: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা

প্রকাশ: ৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ-বাতাস এখন যুদ্ধের বারুদে ভারাক্রান্ত। গাজা, লেবানন থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছেন এক বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে এখন জোর গুঞ্জন উঠেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধই যেন এখন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র হাতিয়ার। নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য তিনি মধ্যপ্রাচ্যের এই ভয়াবহ সংকটকে জিইয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর, যা কেবল ওই অঞ্চলের নয়, বরং পুরো বিশ্বশান্তির জন্য এক বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি সবসময়ই সংকটের মুহূর্তে নিজেকে অজেয় নেতা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে তিনি যে গভীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সাংবিধানিক বা গণতান্ত্রিক পথ তার সামনে আর খোলা নেই। ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিলের প্রাথমিক ধাপ পাস হওয়ার পর তার পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে যুদ্ধই তার জন্য ‘লাইফলাইন’ হয়ে উঠেছে। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর হুমকিকে পুঁজি করে তিনি ইসরায়েলি জনমনে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, যাতে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ধামাচাপা পড়ে যায়। তিনি জানেন, শান্তি আলোচনা শুরু হলে তার যুদ্ধের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে, আর তখনই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কয়েক দফা চেষ্টা করেছে ইসরায়েলকে শান্ত রাখার জন্য। কিন্তু নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমি ও কৌশলগত আগ্রাসন ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নেতানিয়াহু এমনভাবে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছেন যে, ওয়াশিংটন থেকে ধমক বা হুঁশিয়ারি দিয়েও তাকে থামানো সম্ভব হচ্ছে না। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বরফ গলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাতে ক্রমাগত ঘি ঢেলে চলেছেন। লেবানন ফ্রন্টে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক চাল, যার উদ্দেশ্য হলো শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা।

এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে এক বিরাট অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেলের বাজারে এই অস্থিরতা কেবল ইরান বা ইসরায়েলের সংকট নয়, বরং এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেও চাপে ফেলেছে। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আলোচনার টেবিলে বসার জন্য মরিয়া, তখন নেতানিয়াহুর লেবানন ও ইরানকেন্দ্রিক আক্রমণাত্মক নীতি সেই আলোচনার পথকে বন্ধুর করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো প্রকার চুক্তির অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক আধিপত্যের অবসান, যা নেতানিয়াহু কখনোই মেনে নিতে পারছেন না।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংঘাতের পরিণতি অত্যন্ত করুণ। হাসপাতালের পাশে বিমান হামলা, সাধারণ মানুষের মৃত্যু এবং বাস্তুচ্যুতি আজ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে যখন হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন সেই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই স্বাভাবিক। নেতানিয়াহু কি কেবল তার নিজের চেয়ার বাঁচাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে দাউ দাউ করে জ্বলতে দেবেন? সাধারণ মানুষ, যারা যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে, তাদের সুরক্ষার চেয়ে কি একজন রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ারের নিরাপত্তা বড়? এই প্রশ্ন এখন খোদ ইসরায়েলের নাগরিক সমাজেও জোরালো হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, নেতানিয়াহু যদি তার বর্তমান অবস্থান থেকে সরে না আসেন, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে। ট্রাম্প প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে এখন বুঝতে হবে যে, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত এজেন্ডা আর বিশ্ব নিরাপত্তার স্বার্থ এক নয়। যদি শান্তি চুক্তি কার্যকর করতে হয়, তবে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করা ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু নেতানিয়াহু তার ক্ষমতার সমীকরণ এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, যেকোনো শান্তি উদ্যোগকে তিনি তার পরাজয় হিসেবে দেখছেন। এই পরাজয়ের ভয় থেকে তিনি শান্তি চুক্তির প্রতিটি দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন।

পরিশেষে বলা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে ব্যক্তির জেদ বা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ কখনো বড় বাধা হওয়া উচিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী শান্তির স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক মহলকে এখন সময় এসেছে নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধ-রাজনীতির বিপরীতে সোচ্চার হওয়ার। শান্তি চুক্তির দরজা যদি বন্ধই থাকে, তবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না। বরং যুদ্ধকে হাতিয়ার করে ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার যে ঘৃণ্য উদাহরণ তিনি তৈরি করছেন, তা ভবিষ্যতে অন্য নেতাদেরও পথভ্রষ্ট করবে। মানবতা ও বিশ্বশান্তির খাতিরে মধ্যপ্রাচ্যে এখনই শান্তির সুবাতাস প্রয়োজন, আর সেই পথের প্রধান অন্তরায়কে সরিয়ে ফেলাই এখন বিশ্ব রাজনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত