সর্বশেষ :

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে অস্থিরতা: বড় পতনের শঙ্কা?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৯ বার
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে অস্থিরতা: বড় পতনের শঙ্কা?

প্রকাশ: ৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতির বাজারে আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে স্বর্ণ। বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত এই মহামূল্যবান ধাতুর দামের ওঠানামা বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দন হিসেবে কাজ করে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল। কিন্তু সেই আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছানোর পর থেকেই স্বর্ণের বাজারে যেন এক ধরণের অস্থিরতা ও সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দামের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা এটিকে বাজারের স্বাভাবিক চক্র হিসেবে দেখলেও বড় কোনো ধসের পূর্বাভাস নিয়ে বাজারে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

গত দুই দশকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বর্ণের দাম কখনোই একমুখী থাকেনি। শক্তিশালী উত্থানের পর প্রায়ই বড় ধরনের দরপতনের সাক্ষী হতে হয়েছে বাজারকে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ২৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর আগেও ২০০৮ সালের অক্টোবরে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ৬৯৭ ডলারের আশেপাশে, যা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ১৮৮৪ ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু সেই উচ্চতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের আগস্টে দাম ৩৭ শতাংশ কমে ১১৯১ ডলারে নেমে আসে। একইভাবে ২০২০ সালের আগস্টে ২ হাজার ৭২ ডলারের চূড়ায় ওঠার পর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তা ২২ শতাংশ কমে ১৬২০ ডলারে নেমে গিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক তথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—স্বর্ণের দাম যত দ্রুত গতিতে বাড়ে, পরবর্তী সংশোধনের মাত্রা ততটাই প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২৯ জানুয়ারিতে আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৫৯৪ ডলারের রেকর্ড গড়ার পর এখন পর্যন্ত দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৪৭৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতে একে বাজারের স্বাভাবিক সংশোধন মনে হলেও অর্থনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, আগের উত্থান-পতনের ধারা যদি পুনরাবৃত্তি হয়, তবে আগামী মাসগুলোতে বড় ধরনের পতনের ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এবারের অস্থিরতার পেছনে কেবল স্বাভাবিক বাজারচক্র নয়, বরং বৈশ্বিক মুদ্রানীতির জটিল সমীকরণও কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগের মতো স্বর্ণ কেনার ব্যাপক আগ্রহ এখন কিছুটা ঝিমিয়ে এসেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়ের হার আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বাড়লেও গত কয়েক বছরের উচ্চ পর্যায় থেকে তা অনেক নিচে নেমে এসেছে।

স্বর্ণের বাজারের এই অস্থিরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চীন ও ভারতে ভোক্তা চাহিদায় বড় ধরনের ভাটা। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের এই দুই দেশ স্বর্ণের গহনার বৃহত্তম বাজার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে চীনের বাজারে গহনার চাহিদা ৩১ শতাংশ এবং ভারতে ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গহনা শিল্পে সামগ্রিক চাহিদা ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি, এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ-এ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রায় ৭৩ শতাংশ কমে যাওয়া বাজারের আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক স্বর্ণের মোট চাহিদা ৯ শতাংশ কমে যাওয়ার ঘটনাটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

বর্তমানে স্বর্ণের বাজার মূলত মুদ্রানীতির প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। উচ্চ সুদের হারের পরিবেশে আয়হীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ সবসময়ই কম থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার পরিবর্তনের সম্ভাবনা স্বর্ণের দামকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা যখন স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তখন তাকে ‘ফিয়ার ট্রেড’ বা ভয়ভিত্তিক লেনদেন বলা হয়। এই ফিয়ার ট্রেডের কারণে স্বর্ণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু এখন যখন মার্কিন অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কিছুটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, তখন স্বর্ণের দাম স্বাভাবিকভাবেই সংশোধনের মুখোমুখি হচ্ছে।

তেলের দামের সঙ্গে স্বর্ণের বর্তমান সম্পর্কটিও অত্যন্ত জটিল। ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়লে বিশ্ববাজারে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে স্বর্ণের বাজারে চাপ সৃষ্টি করে। আবার শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা বা তেলের দাম স্থিতিশীল হলে স্বর্ণ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এই জটিল সমীকরণের মধ্যে আটকে আছে বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ডলারের বৈশ্বিক অবস্থানের দুর্বলতা বা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে, তার প্রভাবও স্বর্ণের ওপর পড়বে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান সংশোধন প্রক্রিয়াটি আপাতত নিয়ন্ত্রিত হলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝঁকি এখনো রয়ে গেছে।

দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ এখনো নির্ভরযোগ্য হলেও স্বল্পমেয়াদী ট্রেডারদের জন্য বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাজারের এই অস্থিরতা থেকে উত্তরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। স্বর্ণ শুধু এখন সরবরাহ ও চাহিদার পণ্য নয়, বরং এটি বৈশ্বিক রাজনীতির এক সূক্ষ্ম মাপকাঠি। দামের এই পতন যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, স্বর্ণের বাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমানের জটিল বাস্তবতার লড়াই চলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত