প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি সবসময়ই বেশ কড়াকড়ি এবং নিয়মনীতির বেড়াজালে ঘেরা। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটিতে প্রবেশাধিকার লাভের জন্য আবেদনকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হয়। এই যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও সুনির্দিষ্ট এবং স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে নতুন একটি নির্দেশনা জারি করেছে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। এখন থেকে নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির অনভিবাসী ভিসা প্রার্থীদের তাদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস উন্মুক্ত বা ‘পাবলিক’ রাখতে হবে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে দেওয়া এই বার্তাটি ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর ব্যত্যয় ঘটলে আবেদনের প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়তে পারে।
শুক্রবার (৫ জুন) মার্কিন দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এই বিশেষ বার্তাটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নিরাপত্তার খাতিরে এবং ভিসা আবেদনকারীর পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড আরও নির্ভুলভাবে যাচাই করার জন্য এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। গত ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া এই নিয়মটি প্রাথমিকভাবে কিছু নির্দিষ্ট ভিসা ক্যাটাগরির ওপর প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে এ-৩ ও সি-৩ ভিসার অধীনে আবেদনকারী গৃহকর্মী, জি-৫ ভিসা হোল্ডার, এইচ-৩ এবং এইচ-৩ ভিসাধারীদের ওপর নির্ভরশীল এইচ-৪ ভিসা আবেদনকারীরা। এই তালিকার বিস্তার আরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
দূতাবাসের নির্দেশনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কে-১, কে-২, কে-৩, কিউ, আর-১ এবং আর-১ ভিসাধারীদের ওপর নির্ভরশীল আর-২ ভিসা আবেদনকারীরাও এই নতুন নিয়মের আওতাভুক্ত। এছাড়া এস, টি ও ইউ ভিসার জন্য যারা আবেদন করছেন, তাদের প্রত্যেকের জন্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত প্রোফাইল জনসমক্ষে উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই নির্দেশনার অর্থ হলো, এখন থেকে কনস্যুলার কর্মকর্তারা চাইলে আবেদনকারীর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স বা লিংকডইন প্রোফাইল ঘুরে দেখতে পারবেন এবং আবেদনকারী সম্পর্কে তাদের যে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যাচাই করে নিতে পারবেন। এটি মূলত ভিসা আবেদনকারীদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করার একটি বাড়তি স্তর হিসেবে কাজ করবে।
ভিসা প্রত্যাশীদের অনেকেই হয়তো মনে করছেন এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর হস্তক্ষেপ, তবে মার্কিন দূতাবাসের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন ব্যক্তি কেমন জীবনযাপন করেন, কাদের সঙ্গে চলাফেরা করেন এবং তার মতাদর্শ কী—এর সবকিছুরই একটা প্রতিচ্ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভিসা প্রার্থীরা কোনো ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা বা তাদের কার্যকলাপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে কিনা, তা যাচাই করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং একটি আধুনিক টুল বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নির্দেশনা পাওয়ার পর ভিসা আবেদনকারীদের মনে নানা প্রশ্ন জাগতে পারে। অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন যে, তারা অতীতে কী পোস্ট করেছিলেন বা কোন কমেন্ট করেছিলেন তা নিয়ে। দূতাবাস কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছ। তারা মূলত আবেদনকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা যাচাই করতে চান। তাই নতুন এই নিয়মের আওতায় আসার আগে আবেদনকারীদের উচিত তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলো একবার ভালোভাবে পর্যালোচনা করা। কোনো ধরনের বিতর্কিত বা আপত্তিকর কনটেন্ট প্রোফাইলে থাকলে তা আবেদনের আগেই সরিয়ে ফেলা বা সেগুলোর ব্যাপারে ব্যাখ্যা প্রস্তুত রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
মার্কিন ভিসা পাওয়া বরাবরই একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার অংশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেদনকারীকে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া পার হতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল পাবলিক রাখা এখন সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই একটি নতুন ধাপ। এটি শুধু পরিচয় যাচাইয়ের জন্যই নয়, বরং আবেদনকারীর পেশাগত ও ব্যক্তিগত সততা প্রমাণের একটি নতুন মাধ্যম হিসেবেও কাজ করবে। যারা এই নির্দেশনা মেনে চলবেন এবং দূতাবাসের নিয়মাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ করবেন, তাদের আবেদনের পথ আরও মসৃণ হবে বলে আশা করা যায়। ভুল বা অস্পষ্টতা থাকলে ভিসা পাওয়ার সুযোগ যেমন কমে যায়, তেমনি সব নিয়ম মেনে চললে কনস্যুলার অফিসারের আস্থা অর্জন করা সহজ হয়।
বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সাইবার ঝুঁকির কথা বিবেচনা করলে মার্কিন সরকারের এই কঠোর অবস্থান অনেকটা যৌক্তিক বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। ভিসা জালিয়াতি রোধ এবং সঠিক ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রযুক্তিগত নজরদারি এখন সময়ের দাবি। তবে এই নিয়মটি যেন সাধারণ ভিসা প্রার্থীদের জন্য অযথা হয়রানির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও দূতাবাসের নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। ভিসা আবেদনের সময় সঠিক তথ্য প্রদান এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন থেকে প্রতিটি আবেদনকারীর প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, যারা নিকট ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের বা সেখানে কাজ করার বা অভিবাসনের পরিকল্পনা করছেন, তারা যেন দ্রুত এই নতুন নিয়মটি আয়ত্তে আনেন। দূতাবাসের ফেসবুক পেজ বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নিয়মগুলো বারবার পড়ে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি ছোট ভুল বা সেটিংস সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন যেন মাটি না হয়ে যায়। ভিসা প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করলে এবং দূতাবাসের নিয়ম কানুন মেনে চললে স্বপ্নের দেশে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হবে। নতুন এই নিয়মটি আপাতদৃষ্টিতে কড়াকড়ি মনে হলেও, যারা প্রকৃত এবং স্বচ্ছ উদ্দেশ্য নিয়ে আবেদন করছেন, তাদের জন্য চিন্তার কোনো কারণ নেই। নিয়ম মেনে চললে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্জিত আচরণ বজায় রাখলে এই প্রক্রিয়াটি ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য নতুন কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।