১৯ দিনের বিচার, রামিসা হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ০৭ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মাত্র ১৯ দিনের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় ঘটনাটি দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।

রোববার সকালে ঢাকার আদালতপাড়ায় ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আদালত চত্বরজুড়ে মোতায়েন ছিল অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদেরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে আদালতে আনা হয় আসামি স্বপ্না খাতুনকে। পরে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে আদালতে হাজির করা হয় সোহেল রানাকে। দুজনকেই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। পরে রায় ঘোষণার আগে আদালতের এজলাসে তোলা হলে সেখানে উপস্থিত আইনজীবী, সাংবাদিক এবং উৎসুক মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়।

বেলা ১১টার পর বিচারক মাসরুর সালেকীন রায় পড়া শুরু করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত বলেন, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত, ফরেনসিক তথ্য এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালত সোহেল রানাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে লাশ গুমে সহযোগিতা এবং অপরাধে সহায়তার দায়ে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আদালতের রায় ঘোষণার পর নিহত রামিসার পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরিবারের সদস্যরা বলেন, তারা মেয়েকে আর ফিরে পাবেন না। তবে দ্রুত বিচার হওয়ায় অন্তত ন্যায়বিচারের একটি উদাহরণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। আদালত চত্বরের বাইরে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যেও রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। অনেকে বলেন, শিশু নির্যাতন ও নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে এমন দ্রুত বিচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গত ১৯ মে সকালে রাজধানীর পল্লবীতে ঘটে যায় ভয়াবহ এই ঘটনা। মামলার এজাহার অনুযায়ী, পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হয়। পরে কৌশলে তাকে নিজেদের বাসায় ডেকে নেয় স্বপ্না খাতুন। সকাল গড়িয়ে গেলেও রামিসা স্কুলে না পৌঁছানোয় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন তার মা। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে সোহেলের বাসার সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তার মা।

পরিবারের সদস্যরা দরজায় বারবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন তারা দেখতে পান শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে আছে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ। ঘরের ভেতরে থাকা একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির মধ্যে পাওয়া যায় শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা। ভয়াবহ সেই দৃশ্য দেখে এলাকায় শোক এবং ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় এবং স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়।

ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

মামলার তদন্তে নামে পল্লবী থানা পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান মাত্র চার দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র জমা দেন। ২৪ মে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার বিভিন্ন আলামত, মেডিকেল রিপোর্ট এবং জব্দকৃত তথ্য আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে।

এরপর দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। গত ১ জুন আদালত সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। পরদিন ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই দিনই ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। আদালতে সাক্ষীরা ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রসিকিউশন পক্ষ দাবি করে, আসামিদের বিরুদ্ধে থাকা আলামত অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন দুই আসামি। তবে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলে, আসামিদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রমাণের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। সবশেষে ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।

দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার বিচারিক গতি নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ দ্রুত বিচারকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকে বলছেন, বিচার দ্রুত হলেও সেটি যেন পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ হয় সেদিকেও সমান গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন। আইন বিশ্লেষকদের মতে, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধে দ্রুত তদন্ত এবং বিচার জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

রামিসার মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক শোকের সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, নারী ও শিশু অধিকারকর্মী এবং সামাজিক সংগঠন এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানায়। তারা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিচারের রায় দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার করা এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

রামিসা হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এলো শিশু নিরাপত্তা নিয়ে দেশের মানুষের গভীর উদ্বেগ। আদালতের এই রায় এখন উচ্চ আদালতে আপিলের মধ্য দিয়ে পরবর্তী আইনি ধাপ অতিক্রম করবে। তবে আপাতত আলোচিত এই মামলায় দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় জনমনে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত