কন্যা হত্যার রায় শুনতে আদালতে রামিসার বাবা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ০৭ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় করা বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত হয়েছেন তার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। একমাত্র কন্যার নির্মম হত্যার বিচার প্রত্যাশায় সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে ছিলেন তিনি। বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে আদালতের রায় শোনার জন্য তার উপস্থিতি পুরো ঘটনাকে আরও আবেগঘন করে তোলে।

রোববার (৭ জুন) সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে আব্দুল হান্নান মোল্লাকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এ সময় আদালতপাড়ায় ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আলোচিত এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

এর আগে আদালত জানিয়েছিল, শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হবে সকাল ১১টায়। সেই ঘোষণাকে সামনে রেখে সকাল থেকেই আদালতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

রায় ঘোষণার আগে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়। তার কিছু সময় আগে হাজির করা হয় অপর আসামি ও সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। পরে দুজনকেই আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার সময় তাদের আদালতের এজলাসে তোলা হয়।

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই মামলাটি বিচারিক গতির দিক থেকেও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। গত ১৯ মে সংঘটিত ভয়াবহ এই অপরাধের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মামলাটি রায়ের পর্যায়ে পৌঁছায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বহুল আলোচিত অপরাধ মামলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, পল্লবীর একটি বাসায় কৌশলে ডেকে নিয়ে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরে অপরাধ আড়াল করার উদ্দেশ্যে তার মরদেহ বিকৃত করা হয়। ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশ্যে আসার পর সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন পর্যন্ত দ্রুত বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায়।

ঘটনার পরপরই পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তদন্তে সংগৃহীত আলামত, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করা হয়। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

গত ১ জুন আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। একই দিনে অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। পরে ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন আসামিরা। ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।

রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার মুখে ছিল শোক, বেদনা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার ছাপ। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও যে শিশুটি পরিবারের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ তার হত্যার বিচারের জন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে অভিযুক্তরা। আদালতে তার উপস্থিতি শুধু একজন মামলার বাদীর নয়, বরং সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার প্রত্যাশী এক পিতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সমাজে শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র চাইলে ভয়াবহ অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে তারা মনে করেন, বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগও প্রয়োজন।

আদালতের রায়ের মাধ্যমে মামলাটির বিচারিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলেও ঘটনাটি সমাজে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ রামিসার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং শিশু নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে পুরো সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত