প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের এক চরম ও উত্তপ্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। গত কয়েক দশকের মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এমন অস্থিরতা খুব কমই দেখা গেছে। এই উত্তেজনা নিরসনের সকল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ইসরাইল সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে ভয়াবহ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয়কর যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ—উভয় পক্ষই হামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই হামলার পর থেকে গোটা বিশ্বের নজর এখন তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যা পুরো অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের এই আগ্রাসনের মাত্রা ছিল অত্যন্ত তীব্র এবং সুপরিকল্পিত। ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো থেকে আকাশপথে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের বিভিন্ন শহরের আকাশসীমা ভেদ করে সুনির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হামলার পরপরই ইরানের আকাশজুড়ে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যেতে থাকে। বিশেষ করে রাজধানী তেহরান, ঐতিহাসিক শহর তাবরিজ এবং সামরিক ও শিল্প কারখানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইসফাহানে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। শুধু এসব বড় শহরই নয়, বরং মধ্যাঞ্চলের কারাজ শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইসরাইলি হামলার পরিধি ছিল বেশ বিস্তৃত। আল জাজিরার প্রতিবেদনে তেহরানে অন্তত দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আর ইসফাহানে কমপক্ষে তিনটি বিস্ফোরণ ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ওপর এক গভীর আঘাতের বার্তা বহন করছে।
এই হামলার ফলে ইরানের সাধারণ জনজীবনে নেমে এসেছে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা। তেহরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ খামেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সকল ধরনের বাণিজ্যিক ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। আকাশপথের এই নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতি যে কতটা জটিল ও উদ্বেগজনক, তা স্পষ্ট করে তোলে। বিমানবন্দরগুলোর বাইরে আটকা পড়া সাধারণ মানুষ এবং আতঙ্কিত যাত্রীদের ভিড় পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান পরিচালনা করেছে। তাদের এই দাবি যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদী করার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান যে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, তাকেই এই হামলার প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখছে ইসরাইল। এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুই দেশের মধ্যকার শত্রুতা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।
গত এপ্রিলের শুরুর দিকে ইরান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতির একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে। রোববার ইসরাইলের দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, লেবাননের ওপর ইসরাইলের অনবরত হামলা এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর আক্রমণের উপযুক্ত জবাব দিতেই তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তাদের মতে, আত্মরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে তারা এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে ইসরাইল এই ঘটনাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হামলা হিসেবে বিবেচনা করে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বর্তমানে নিজ দেশের ভেতর থেকেই ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে যুদ্ধের তীব্রতা, অন্যদিকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ—নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে তাদের প্রাণঘাতী হামলার পর থেকেই তারা এক চরম উত্তেজনার মধ্যে ছিল। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যে ইরান থেকে ভয়াবহ গোলাবর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে, তা তারা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। এজন্যই তারা দেশজুড়ে হাই অ্যালার্ট জারি করে। উত্তর ইসরাইলের হাইফা এবং এর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য এলাকায় ক্রমাগত সাইরেন বেজে ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আয়রন ডোম দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার চেষ্টায় ইসরাইলি আকাশ এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই সংঘাত এখন কেবল ইরান বা ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে। তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সবই এখন চরম ঝুঁকির মুখে। এখন দেখার বিষয়, এই ভয়াবহ সংঘাত কোথায় গিয়ে শেষ হয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কি না।