প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েকদিন ধরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরানের ভূখণ্ডে ইসরাইলের সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ইয়েমেন থেকে সরাসরি ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় তেল আবিব ও জেরুজালেমসহ ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। সোমবার সকালে আকস্মিক এই হামলায় পুরো অঞ্চলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর কেবল দুই বা তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি ইসরাইলের আকাশসীমায় প্রবেশের সময়ই সতর্কতা সংকেত সক্রিয় করা হয়। তেল আবিব ও জেরুজালেমের মতো জনবহুল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরে সাইরেন বাজার পর আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে ছোটাছুটি শুরু করেন। ইসরাইলের জরুরি সেবা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে জরুরি আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে একজন ব্যক্তি পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন, যাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বা আইডিএফ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আয়রন ডোম সফলভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করেছে এবং বর্তমানে নতুন কোনো হুমকি নেই। জনগণকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত এবং বর্তমান পরিস্থিতির পেছনের কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ধারাবাহিকতা মাত্র। লেবাননে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর প্রায় দুই মাস পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। সেই হামলার জবাবেই ইসরাইলি বিমান বাহিনী ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আক্রমণ চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-এর তথ্যমতে, ইসরাইল আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তেহরান, তাবরিজ ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ভয়াবহ হামলা পরিচালনা করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনেও তেহরানে অন্তত দুটি এবং ইসফাহানে তিনটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী বরাবরই ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে আসছে। অতীতেও তারা লোহিত সাগর এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা যখন সরাসরি ইসরাইলের রাজধানী লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, তখন তা কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং একটি প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই হামলার মাধ্যমে হুতিরা এটিই প্রমাণ করতে চাইছে যে, তাদের সক্ষমতা এখন অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে ইসরাইলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একদিকে উত্তর সীমান্ত থেকে লেবানন ও ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর চাপ, অন্যদিকে দক্ষিণ ও দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা—সব মিলিয়ে ইসরাইলের জন্য একটি জটিল ও বহুমুখী সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে এখন কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়। একদিকে নেতানিয়াহু সরকারের কঠোর সামরিক নীতি, অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার প্রচেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। আকাশপথে আক্রমণের ভয়ে নাগরিকদের জীবনযাত্রা থমকে গেছে। আন্তর্জাতিক মহল এই সংঘাত নিরসনে বারবার আহ্বান জানালেও কার্যত কোনো সুফল মিলছে না। সিরিয়া, লেবানন, ইরান এবং ইয়েমেন—এক বিশাল অঞ্চলজুড়ে যে অস্থিরতার আগুন জ্বলছে, তা যেকোনো সময় তৃতীয় কোনো বড় বিশ্বশক্তির হস্তক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সোমবার সকালের এই সাইরেন কেবল একটি সংকেত ছিল না, বরং এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের শুরু। ইসরাইল দাবি করছে যে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং হুতিদের হামলা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের আক্রমণ যে বারবার ঘটছে, তা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি করছে। যুদ্ধের এই ডামাডোলে সাধারণ মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক আলোচনার পথগুলো এখন প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই আঞ্চলিক উত্তাপ আরও কত দূর পর্যন্ত গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সমাপ্তি কীভাবে ঘটে। বিশ্ববাসী এখন এক আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে যে, কোনো ছোট ভুল পদক্ষেপ হয়তো পুরো অঞ্চলকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের আগুনে নিমজ্জিত করবে।