সর্বশেষ :
কলকাতা থেকে পরিচালিত অপারেশন: আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ছক দেউলিয়া থেকে ডাটা কিং: রবিন খুদার AirTrunk সাম্রাজ্যের ওয়াল স্ট্রিট গল্প আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ সংসদে ১১ জুন পেশ হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ইউনূস ও নূরজাহানসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন: আদেশ অপেক্ষমাণ জেলায় জেলায় ভুয়া কমিটি নিয়ে বিএনপির সতর্কবার্তা আইনি লড়াই শেষে কাজে ফিরছেন অভিনেতা কিম সু-হিউন লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি হানিফ আমিনবাজার ভূমি অফিসে অনুপস্থিত কর্মকর্তা, প্রতিমন্ত্রীর ক্ষোভ ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহক ফোরামের কলমবিরতি: অচলাবস্থায় সেবা কার্যক্রম

দেউলিয়া থেকে ডাটা কিং: রবিন খুদার AirTrunk সাম্রাজ্যের ওয়াল স্ট্রিট গল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ৬৪ বার
দেউলিয়া থেকে ডাটা কিং: রবিন খুদার AirTrunk সাম্রাজ্যের ওয়াল স্ট্রিট গল্প

স্টাফ রিপোর্টার । একটি বাংলাদেশ অনলাইন । ৮ই জুন’ ২০২৬

রবিন খুদার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের ঢাকায়, পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ জেলার ছাতিয়ানটোলী গ্রামে। শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও এসওএস হারম্যান গমাইনার কলেজে পড়াশোনা শেষে ১৯৯৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান। সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে অ্যাকাউন্টিং-এ স্নাতক, ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ এবং সার্টিফাইড প্র্যাকটিসিং অ্যাকাউন্ট্যান্ট-এর সনদ অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ফুজিৎসু, পাইপ নেটওয়ার্কস ও নেক্সটডিসি-র মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট্যান্ট থেকে শুরু করে চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ও নির্বাহী পরিচালক পদে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি সিডনিতে স্ত্রী, দুই কন্যা ও পিতামাতার সাথে বসবাস করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।

২০১৫ সালে রবিন খুদা ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য সাশ্রয়ী ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী বিশাল আকারের তথ্যকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে AirTrunk প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় তিনি ব্যক্তিগত পেনশন, সঞ্চয় এমনকি সিডনির নিজের বাড়ি বিক্রি করে দেন এবং একপর্যায়ে দেউলিয়া হওয়ার আইনি পরামর্শ নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে তিনি ৪০০ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহে সক্ষম হন এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে প্রথম হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার চালু করেন। ২০২০ সালে ম্যাকোয়ারি গ্রুপ ও একটি কানাডীয় পেনশন তহবিল কোম্পানিটির ৮৮ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়, যা AirTrunk-এর মূল্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। সবশেষে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন ও কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ড ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) দিয়ে AirTrunk অধিগ্রহণ করে। এটি বিশ্বের ডাটা সেন্টার খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লেনদেন। কোম্পানি বিক্রি করলেও রবিন খুদা সিইও হিসেবে বহাল আছেন এবং এতে একটি ছোট কিন্তু মূল্যবান শেয়ার ধরে রেখেছেন।

AirTrunk যে ব্যবসায়িক পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাকে ‘ডিজিটাল জমিদার’ মডেল বলা যেতে পারে। কোম্পানিটি সরাসরি সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত সেবা বিক্রি না করে বিশাল আকারের হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার নির্মাণ করে এবং সেগুলোর স্থান, বিদ্যুৎ ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে ভাড়া দেয়। এই চুক্তিগুলো নিয়মিত ও পূর্বানুমানযোগ্য আয় নিশ্চিত করে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালানোর জন্য অত্যাধুনিক ডাইরেক্ট-টু-চিপ লিকুইড কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে AirTrunk এআই কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেও চুক্তি পাচ্ছে। বিশাল আকারের কারণে প্রতি ইউনিট খরচ কমে যাওয়ায় তারা সাশ্রয়ী মূল্য দিতে সক্ষম, যা বড় বড় ক্লায়েন্টদের আকর্ষণ করে। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১১ গুণ।

AirTrunk বর্তমানে বিশ্বের ছয়টি অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে সদর দপ্তর ও প্রথম ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার পর তারা সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপানের টোকিও ও ওসাকা এবং মালয়েশিয়ার জোহর বাহরুতে ডাটা সেন্টার ক্যাম্পাস চালু করে। মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় জোহর বাহরুতে আরও দুটি নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের কথা জানানো হয়েছে, যাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এবং মোট ক্ষমতা ৭০০ মেগাওয়াট অতিক্রম করবে। অতি সম্প্রতি লিংকডইন প্রোফাইলে মধ্যপ্রাচ্যকে কার্যক্ষেত্র হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুনে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে রবিন খুদা ভারতে ২১ বিলিয়ন ডলারের একটি ডাটা সেন্টার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছেন।

AirTrunk বিক্রির পর রবিন খুদার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা তাকে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের একজন এবং বিশ্বের অন্যতম সফল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। তিনি কোম্পানিতে প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ মালিকানা ধরে রেখেছেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এছাড়া লিংকডইন প্রোফাইল ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অস্ট্রেলিয়ায় লাক্সারি বিচফ্রন্ট অ্যাপার্টমেন্ট ও পেন্টহাউস উন্নয়নের সাথেও জড়িত, যা থেকে তিনি ‘অত্যন্ত ভালো রিটার্ন’ পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি দাতব্য কাজেও যুক্ত। সম্প্রতি এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায় ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক দাতব্য অনুদান। এই অর্থ স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ে পড়ুয়া নারী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও গবেষণা অনুদানে ব্যয় করা হবে। কোম্পানি বিক্রির পর তিনি কর্মচারীদের মধ্যে ২২ মিলিয়ন ডলার বোনাস বিতরণ করেছেন।

হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার হলো এতোবৃহৎ তথ্যকেন্দ্র যা একসাথে হাজার হাজার সার্ভার ধারণ করতে পারে এবং প্রায় অসীম পরিমাণে সম্প্রসারণযোগ্য। এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয় এবং অত্যাধুনিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। প্রচলিত ডাটা সেন্টার যেখানে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাজে ব্যবহৃত হয় এবং মাত্র কয়েক শত থেকে হাজার সার্ভার রাখতে পারে, সেখানে হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার একসাথে কয়েক লক্ষ সার্ভার ধারণ করে এবং বহু প্রতিষ্ঠানকে ক্লাউড সেবা দিতে সক্ষম। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে ৯০০-এর বেশি হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার সক্রিয় রয়েছে, যাদের অধিকাংশের মালিক অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা ও অ্যাপলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে এগুলোর সর্বোচ্চ ঘনত্ব দেখা যায়। ইউরোপের মূল কেন্দ্রগুলো হলো লন্ডন, আমস্টারডাম, প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও ডাবলিন। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সিঙ্গাপুর, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, মালয়েশিয়া এবং সম্প্রতি ভারতে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বহু দেশে AirTrunk-এর উপস্থিতি থাকলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কেন কোনো বিনিয়োগ হয়নি—এটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। এর পেছনে ব্যবসায়িক ও পরিকাঠামোগত কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, AirTrunk-এর মূল গ্রাহক মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো বৈশ্বিক ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। তারা যেসব দেশে ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে, তা সেখানকার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা, ডিজিটাল অর্থনীতির আকার এবং ব্যবসার পরিধির ওপর নির্ভর করে। ভারতের প্রায় ১৫০ কোটি জনসংখ্যার ডিজিটাল চাহিদা এই অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয়ত, একটি হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার চালাতে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন। বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এই ধরনের বিশাল বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট স্থিতিশীল নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তৃতীয়ত, বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ভারত দীর্ঘদিন ধরে একটি স্পষ্ট ও স্থিতিশীল ডাটা সেন্টার নীতি প্রণয়ন করেছে, যা বাংলাদেশে এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠেনি। রবিন খুদা নিজেই এই খাতটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সোনার খনির মতো’ আখ্যা দিয়েছেন; স্বাভাবিকভাবেই তিনি এবং তার সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীরা সেই জায়গাগুলোতে বিনিয়োগ করবেন যেখান থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি রবিন খুদার ব্যক্তিগত অনাগ্রহের কারণে নয়, বরং সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক ও পরিকাঠামোগত সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যতে যখন বাংলাদেশের ডিজিটাল বাজার আরও পরিণত হবে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিমালার নিশ্চয়তা তৈরি হবে, তখন এই ধরনের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

রবিন খুদার জীবনকাহিনী একজন সাধারণ ঢাকার কিশোর থেকে বিশ্ববিখ্যাত উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এক অসাধারণ উদাহরণ। সঠিক সময়ে সঠিক শিল্প নির্বাচন, কঠোর পরিশ্রম, দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকেও না ভাঙা মনোবল এবং ব্যবসায়িক কৌশলের কারণেই তিনি আজ এ সাফল্য অর্জন করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত AirTrunk কেবল একটি কোম্পানি নয়, বরং ডিজিটাল যুগের পরিকাঠামো গড়ার এক মাইলফলক। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ কীভাবে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রবিন খুদা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত