প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম কৌশলগত ও স্পর্শকাতর অঞ্চল হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি গানশিপ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এমন এক সময় এ ঘটনা ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে এ ঘটনায় স্বস্তির খবর হলো, হেলিকপ্টারটির দুই পাইলটই নিরাপদ আছেন এবং কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
মঙ্গলবার (৯ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেরার আগে নিউইয়র্কের জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “কেউ আহত হয়নি।” তিনি জানান, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন মঙ্গলবারের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে।
তবে হেলিকপ্টারটি কীভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ইরানের হামলার শিকার হয়ে ভূপাতিত হয়েছে, নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এ বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তির বরাতে জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার কারণ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনের বড় অংশ এই প্রণালী দিয়েই সম্পন্ন হয়। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতিতেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের আরোপিত অবরোধ ও সামরিক তৎপরতা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন ব্যবহার করে টহল ও নজরদারি পরিচালনা করা হচ্ছে।
সাধারণত অ্যাপাচি হেলিকপ্টারকে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উন্নত রাডার ব্যবস্থা, শক্তিশালী মিসাইল এবং নির্ভুল হামলার সক্ষমতার কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার হিসেবে পরিচিত। মূলত স্থল অভিযানে সেনাদের সহায়তা, শত্রুপক্ষের সাঁজোয়া যান ধ্বংস এবং সীমান্ত নজরদারিতে এই হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোকে আরও গভীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ার পর এটি প্রথম অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। এর আগে উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলেও বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা তুলনামূলক কম ছিল।
অন্যদিকে ইরানও নিজেদের সামরিক সাফল্যের দাবি অব্যাহত রেখেছে। দেশটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা সম্প্রতি ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। যদিও এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন সামরিক সূত্রগুলো বলছে, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ কারণে প্রণালীটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এরই মধ্যে রোববার সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালী এলাকায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা দুটি ইরানি ড্রোন তারা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। একটি ছোট দুর্ঘটনা কিংবা ভুল বোঝাবুঝিও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যখন দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরছে এবং কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, তখন প্রতিটি ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তি উদ্বেগের জন্ম দেয়।
তবে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় প্রাণহানি না হওয়ায় আপাতত বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়ানো গেছে। পাইলটদের নিরাপদ উদ্ধার আন্তর্জাতিক মহলেও স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে, কারণ সেটিই নির্ধারণ করবে এটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতিতে আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহল মনে করছে, তদন্তের ফলাফল শুধু একটি সামরিক দুর্ঘটনার কারণই ব্যাখ্যা করবে না; বরং তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি এটি শত্রুপক্ষের হামলার ফল হয়ে থাকে, তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর যদি যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হয়, তাহলে অন্তত তাৎক্ষণিক সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা কমবে।
এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রপথে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার প্রতিটি ঘটনাই বিশ্ব রাজনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন অপেক্ষা করছে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য, যা হয়তো এই ঘটনার অন্তরালের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করবে।