সর্বশেষ :
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ খাতে বরাদ্দ কমায় উদ্বেগ তামাকমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারে প্রস্তাবিত বাজেট: বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগে গতি ফিরবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নয়, লাইসেন্স বাতিল হয়েছে প্যাথলজি সেন্টারের: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা খুলনায় গুলিতে নিহত বিএনপি নেতা ঢাকাইয়া রফিক, এলাকায় চাঞ্চল্য বাজেটে ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি, সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন জামায়াতের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারে জেলা কমিটি বাজেটে সংস্কার দেখছেন না নাহিদ ইসলাম দেশকে সম্মানে ফেরানোর অঙ্গীকার মঈন খানের চলে গেলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী ব্রিতো

তৃণমূলে বড় ভাঙনের শঙ্কা, চাপে মমতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
  • ২৩ বার

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর দলটির ভেতরের অস্থিরতা এবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে তৃণমূলের অন্তত ১৯ জন লোকসভা সদস্য আলাদা অবস্থান নিতে চান বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। তাদের একাংশ বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএর সঙ্গে সংসদে অবস্থান নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের হাতে আসা একটি চিঠিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর রয়েছে। চিঠিটি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে বিদ্রোহী সাংসদরা তৃণমূল থেকে পৃথক অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা সংসদে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন। এই দাবি সত্য হলে, এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে দেখা যেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় তৃণমূলের বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ ও ইউসুফ পাঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সায়নী ঘোষ তৃণমূলের তরুণ প্রজন্মের অন্যতম আলোচিত মুখ। ইউসুফ পাঠান আবার ক্রিকেট থেকে রাজনীতিতে আসা পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাই তাদের নাম বিদ্রোহী তালিকায় থাকার দাবি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস বহু বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নেতৃত্বে এগিয়েছে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার পর মমতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখ হয়ে ওঠেন। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ধাক্কা, সাংগঠনিক অসন্তোষ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষোভ দলটির ভেতরে চাপ বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের এই সংকট শুধু একটি দলের ভেতরের ঘটনা নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদন বলছে, গত ১৮ মে লোকসভার স্পিকারের কাছে বিদ্রোহী সাংসদরা চিঠি পাঠান। এরপর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও স্পিকারের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পরিবর্তে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের প্রধান হুইপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এই পাল্টা পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, তৃণমূল নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। দলের সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মমতা শিবির দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।

কাকলি ঘোষ দস্তিদার এর আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তৃণমূলের একটি অংশ দল থেকে আলাদা অবস্থান নিতে প্রস্তুত। তিনি সরাসরি সব নাম প্রকাশ করেননি। তবে সংসদে আলাদা বসার ব্যবস্থা চাওয়া এবং বিজেপির প্রতি সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তার বক্তব্যের পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে ভাঙনের জল্পনা জোরালো হয়। এবার চিঠির দাবি সামনে আসায় সেই জল্পনা আরও বাড়ল।

এই পরিস্থিতির মধ্যে তৃণমূলের কয়েকজন রাজ্যসভার সদস্যের পদত্যাগও আলোচনায় এসেছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, প্রকাশ বারাইক রাজ্যসভার সদস্যপদ ছেড়েছেন। এর আগে সুশ্মিতা দেব ও সুখেন্দু রায়ও পদত্যাগ করেন। তবে তারা বিদ্রোহী সাংসদদের চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই এই পদত্যাগগুলোকে সরাসরি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অংশ বলা এখনই নিরাপদ নয়। তবু ধারাবাহিক পদত্যাগ দলটির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

ভারতের দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী, কোনো দলের নির্বাচিত সদস্যদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে নির্দিষ্ট সংখ্যার সমর্থন প্রয়োজন। তৃণমূলের লোকসভা সদস্য সংখ্যা ২৮ হলে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের কাছে সেই সংখ্যাটি রয়েছে। তাই তারা সংসদে আলাদা অবস্থানের দাবি তুলছে। তবে এই দাবির চূড়ান্ত গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্ত এবং আইনি ব্যাখ্যার ওপর।

অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতারা এই ঘটনাকে রাজনৈতিক চাপ ও প্রলোভনের ফল হিসেবে দেখছেন। তৃণমূল নেতা কীর্তি আজাদ অভিযোগ করেছেন, বিজেপি চাপ সৃষ্টি করে এবং নানা প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকজন সাংসদের স্বাক্ষর নিয়েছে। তিনি বিজেপির কথিত ‘অপারেশন লোটাস’-এর সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, যারা দল ছাড়তে চান তারা যেতে পারেন। তবে তারা প্রকৃত তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করেন না।

বিজেপি অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে আসছে। বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপি শিবির দাবি করছে, তৃণমূলের ভেতরের অসন্তোষ আর চাপা নেই। দলটির অনেক নেতা মমতার নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। অন্যদিকে তৃণমূল বলছে, বিজেপি গণতান্ত্রিক রাজনীতির বদলে দল ভাঙার রাজনীতি করছে।

তৃণমূলের ভেতরের অসন্তোষের পেছনে কয়েকটি বিষয় আলোচনায় আছে। দলীয় সিদ্ধান্তে সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামত গুরুত্ব পায় না বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত বলেও অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগও তোলা হচ্ছে। চারবারের সাংসদ শতাব্দী রায়ও বলেছেন, দলের ভেতরে অনেক সময় নিচুতলার কথা গুরুত্ব পায়নি।

রাজনীতিতে এমন ভাঙন শুধু নেতৃত্বের সংকট তৈরি করে না। এটি কর্মী-সমর্থকদের মনেও অনিশ্চয়তা বাড়ায়। বহু মানুষ তৃণমূলকে মমতার সংগ্রামী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখতেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান, সব জায়গায় মমতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ছিল দলের বড় শক্তি। সেই দলেই যদি একসঙ্গে এতজন সাংসদ আলাদা পথ নিতে চান, তাহলে তা তৃণমূলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা।

তবে এখনো পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত নয়। বিদ্রোহী সাংসদদের দাবি, তৃণমূল নেতৃত্বের পাল্টা অবস্থান, স্পিকারের সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আগামী কয়েক দিন এই ইস্যুকে ঘিরেই উত্তপ্ত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলকে কত দ্রুত এক রাখতে পারেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

একসময় যে তৃণমূল কংগ্রেস মমতার দৃঢ় নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছিল, সেই দল এখন নিজের ঘর সামলানোর কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে। এই সংকট মিটে গেলে মমতা আবারও দলকে গুছিয়ে নিতে পারেন। আর যদি বিদ্রোহী শিবির তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে তৃণমূলের ভাঙন, বিজেপির উত্থান এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত