প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, তামাকবিরোধী সংগঠন এবং নীতিনির্ধারণী মহলের একাংশ। তাদের মতে, বাজেটে তামাকপণ্যের ওপর কর ও মূল্য কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল, যাতে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত হয় এবং নতুন প্রজন্মকে ধূমপানের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা যায়। কিন্তু প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্বনীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কারণ তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের পাশাপাশি করনীতি সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। তামাকপণ্যের দাম যত বাড়ে, ব্যবহার তত কমে—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের জটিলতা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং চিকিৎসা ব্যয় দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
তাদের মতে, বাজেটে তামাকপণ্যের কর কাঠামো আরও সহজ ও কার্যকর করা প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের জন্য পৃথক মূল্য ও করব্যবস্থা থাকায় অনেক ব্যবহারকারী তুলনামূলক কমদামের পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে কর বৃদ্ধির উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হয় না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে একটি একক ও সরল করব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন, যাতে সব ধরনের তামাকপণ্যের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও মনে করেন, তামাকপণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের মতে, কর বৃদ্ধির ফলে ব্যবহার কমলেও সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সেই অর্থ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা সম্ভব।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, তামাকশিল্প বিভিন্ন সময় কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে থাকে। তারা প্রায়ই দাবি করে যে, অতিরিক্ত কর আরোপ করলে চোরাচালান বা অবৈধ বাণিজ্য বাড়তে পারে। তবে জনস্বাস্থ্য গবেষকরা বলছেন, কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ সফলভাবে উচ্চ করনীতি প্রয়োগ করে তামাক ব্যবহার কমিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা কমানো এবং তরুণদের মধ্যে ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে মূল্যবৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ মূলত কমদামের তামাকপণ্য ব্যবহার শুরু করে। দাম বাড়লে নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগের কারণে প্রতিবছর যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি। চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা বিবেচনায় নিলে তামাক নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
এদিকে বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কয়েকটি স্বাস্থ্যবিষয়ক সংগঠন বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আরও উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ নেওয়া যেত। বিশেষ করে সিগারেট, বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি, মূল্যস্তর পুনর্বিন্যাস এবং তামাকশিল্পের বিপণন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ছিল।
তারা আরও উল্লেখ করেন, সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গীকারের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির আলোকে বাজেট নীতিতে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ছিল।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করেন, বাজেট প্রণয়নের সময় রাজস্ব আহরণ, শিল্পখাতের বাস্তবতা, কর্মসংস্থান এবং বাজার পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে করনীতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন। তবে তারা স্বীকার করেন যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণ কেবল স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই একটি তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে বাজেট, আইন, সচেতনতা কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
সচেতন মহল বলছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে তামাক ব্যবহার কমানোর বিষয়টিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ তামাকজনিত রোগ শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না, বরং পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, বর্তমান বাজেট কাঠামো তামাকমুক্ত বাংলাদেশের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে যথেষ্ট সহায়ক নয়। তারা কর ও মূল্যনীতি পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।