প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকৃত। তবে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল, শ্রমবাজার বিশ্লেষক এবং প্রবাসী অধিকারকর্মীরা।
তাদের মতে, বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয়, দক্ষতা উন্নয়ন, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কল্যাণ খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়া সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। যদিও সরকার বলছে, বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং অর্থের কার্যকর ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কমে যাওয়া ভবিষ্যতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের মধ্যেও প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে চলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি খাতে বিনিয়োগ কমানো হলে দক্ষ কর্মী তৈরি, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী তৈরির প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
অভিবাসন গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে শুধু শ্রমশক্তি নয়, দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, প্রকৌশল এবং কারিগরি খাতে দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়, তাহলে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে বাজেটে বরাদ্দ কমে যাওয়া কিছুটা হতাশাজনক বলে মনে করছেন তারা।
প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রাক-প্রস্থান প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, আইনি সচেতনতা এবং নিরাপদ অভিবাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে নির্যাতনের শিকার বা কর্মহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের সহায়তায় বিশেষ তহবিল শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। তারা মনে করেন, এসব খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিবর্তে হ্রাস পাওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এদিকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কল্যাণে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প, কল্যাণ বোর্ডের কার্যক্রম এবং পুনর্বাসন উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শ্রমিক চুক্তি জটিলতা, বেতন বকেয়া, পাসপোর্ট জব্দ, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং আইনি সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা সমাধানে দূতাবাস ও শ্রম উইংগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাজেট বরাদ্দ কমে গেলে এ ধরনের সেবার মান উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
প্রবাসী পরিবারগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিকের আয়ের ওপর নির্ভর করে দেশের বহু পরিবার। তাই প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা কেবল একটি খাতভিত্তিক দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিদেশে কোনো শ্রমিক সমস্যায় পড়লে তার প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, বরং পুরো পরিবারের ওপর পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, বরাদ্দ কমলেও যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায় এবং অপচয় কমানো সম্ভব হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যেতে পারে। তাদের মতে, বাজেটের অঙ্কের পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ফলে অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
তবে সমালোচকদের যুক্তি হলো, প্রবাসী আয়ের ওপর এত বড় নির্ভরশীল অর্থনীতিতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত প্রতীকী দিক থেকেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। তারা মনে করেন, সরকার যদি প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে বাজেটে তাদের কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল।
নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব বাজারে প্রবেশের জন্য ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন অপরিহার্য।
প্রবাসী অধিকারকর্মীরা আরও উল্লেখ করেন, বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন কর্মসূচি এখন সময়ের দাবি। অনেক শ্রমিক দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ শেষে দেশে ফিরে নতুনভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হন। তাদের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সহজ ঋণ এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। বাজেট বরাদ্দ কমে গেলে এসব কর্মসূচি সম্প্রসারণ কঠিন হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা জাতীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি।
এখন সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে বাজেটে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে আরও বিনিয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা মানেই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করা।