ক্রিকেটার নাঈম হেনস্তা: তিন পুলিশ প্রত্যাহার, মামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
  • ৪৪ বার

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে তাকে আটক করার চেষ্টা, শারীরিক নির্যাতন এবং অপমানজনক আচরণের অভিযোগ ওঠার পর অভিযুক্ত এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবারের দায়ের করা মামলায় একজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঘটনাটি শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ সামনে আসার পর দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

জানা গেছে, শুক্রবার (১২ জুন) রাতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে চট্টগ্রামে ফেরেন নাঈম হাসান। রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে তার ফ্লাইট চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দর থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তিগত যানবাহন না পেয়ে তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় রওনা দেন। কিন্তু পথিমধ্যে টোল প্লাজার কাছাকাছি এলাকায় তার যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।

নাঈমের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে একজন ট্রাফিক পুলিশ তাদের গাড়ি থামান এবং কিছু দূর পর্যন্ত সঙ্গে যান। পরে আরও কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তাদের মধ্যে একজন পুলিশ পোশাকে এবং আরেকজন সাদা পোশাকে ছিলেন। তারা গাড়ি তল্লাশির কথা বলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে নাঈম গণমাধ্যমকে জানান, শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন নিয়মিত নিরাপত্তা তল্লাশির অংশ হিসেবে তার ব্যাগ পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে অভিযুক্ত এসআই শফিক তাকে জোরপূর্বক সিএনজির ভেতরে ঠেলে দেন এবং গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর তাকে একজন আসামি বলে সম্বোধন করা হয় এবং কথা বলতে নিষেধ করা হয়।

জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার দাবি করেন, তিনি কারণ জানতে চাইলে তার কলার চেপে ধরা হয় এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। শুধু তাই নয়, তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনাক্রমে তিনি ভীত হয়ে পড়েন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন।

নাঈম আরও বলেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই তাকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন এবং পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানান। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টরা সেই পরিচয়কে গুরুত্ব দেননি। বরং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও কঠোর আচরণ করা হয়। তিনি জানান, একপর্যায়ে তার গলা চেপে ধরা হয়েছিল এবং তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলেন।

পরবর্তীতে তাকে থানায় নেওয়া হয় বলে জানান নাঈম। সেখানে তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরেন এবং কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চান। তার দাবি, শুরুতে থানায়ও তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। তবে বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার পর এবং প্রভাবশালী মহল থেকে যোগাযোগ শুরু হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।

নাঈম সরাসরি এসআই শফিকের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কোনো নাগরিককে অকারণে মারধর করার অধিকার নেই। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করলেও তাকে শোনা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন আচরণ নিয়ে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক সাবেক ও বর্তমান ক্রীড়াবিদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একজন পরিচিত জাতীয় ক্রিকেটার যদি এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত।

এ ঘটনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিযুক্ত এসআইসহ তিন সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নাঈমের পরিবারের পক্ষ থেকে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার ভিত্তিতে একজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। ঘটনাস্থলের সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো নাগরিককে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আইন প্রয়োগের নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। তাই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন।

জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসা নাঈম হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরিচিত মুখ। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে তার অবদান রয়েছে। ফলে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বর্তমানে ক্রীড়াঙ্গন, মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের দৃষ্টি এখন তদন্তের অগ্রগতির দিকে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন এই বহুল আলোচিত ঘটনার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত