প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর প্রাণঘাতী ঝড়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন পটুয়াখালীর ৯ জেলে। দীর্ঘ পাঁচদিন সাগরে ভেসে থাকার পর অবশেষে উপকূলে ফেরা সম্ভব হলেও এখনও খোঁজ মেলেনি আরও ৬ জন জেলের। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার উপকূলীয় এলাকা কুয়াকাটার সমুদ্রে। উদ্ধার হওয়া জেলেদের এখন চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
প্রাণে বেঁচে ফেরা জেলেরা হলেন—রাজিব, রাহাত, হাসান, হাসান-২, সাগর, সাগর-২, গিয়াস, হারুন-২ ও ইব্রাহিম। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আব্দুর রশিদ, নজরুল ইসলাম, রফিক, ইদ্রিস, হারুন ও কালাম। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে তারা এমন এক বিপর্যয়ের শিকার হন, যা তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৩ জুলাই সকালে কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের বানাতি বাজার এলাকা থেকে ছয়টি মাছধরা ট্রলার একযোগে বঙ্গোপসাগরের গভীরে যায়। ওইদিন যাত্রা করা ট্রলারগুলোর মধ্যে ‘এফবি সাগরকন্যা’ নামের একটি ট্রলার ২৬ জুলাই (শুক্রবার) সকাল ১০টার দিকে বঙ্গোপসাগরের শেষ বয়া থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার গভীরে প্রবল ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে। প্রচণ্ড স্রোতের তোড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।
উদ্ধার হওয়া জেলেদের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা সাগরে জাল ফেলার পরই আচমকা এক প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল এক ঢেউ এসে ট্রলারটিকে দুমড়ে-মুচড়ে উল্টে দেয়। তৎক্ষণাৎ একজন জেলে নিখোঁজ হন। বাকি ১৪ জন জীবনের তাগিদে ট্রলারের কাঠ, বাঁশ, জাল ও ফ্লোটিং ড্রাম ধরে সাগরে ভেসে থাকেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে তারা একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করলেও পরবর্তী চারদিনে ভয়ংকর ঢেউয়ের আঘাতে ছিটকে পড়েন অনেকেই। পর্যায়ক্রমে আরও পাঁচজন নিখোঁজ হয়ে যান।
বাকি ৯ জন যখন জীবনের শেষ আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন সোমবার রাতে বঙ্গোপসাগরের শেষ বয়া এলাকায় ভেসে ওঠেন। সেখানেই থাকা অপর দুটি মাছধরা ট্রলার তাদেরকে খুঁজে পেয়ে উদ্ধার করে এবং উপকূলে নিয়ে আসে। এরপর তাদের তাৎক্ষণিকভাবে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
এ বিষয়ে মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ হাসান গণমাধ্যমকে জানান, ট্রলার ডুবির ঘটনার পরপরই ‘এফবি সাগরকন্যা’র মালিক কিশোর হাওলাদার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। বাকি নিখোঁজদের উদ্ধারে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও উদ্ধার তৎপরতা চালু রয়েছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয়দের মতে, সাগরে ট্রলারডুবির এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং উপকূলীয় জেলেপাড়ার অনিরাপদ জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রতি বর্ষায় বঙ্গোপসাগরে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা না থাকায় এই জেলেরা মৃত্যুকে সঙ্গী করেই জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হন।
উদ্ধার হওয়া জেলেদের পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে স্বস্তির পাশাপাশি অনিশ্চয়তার ছায়াও দেখা দিয়েছে। এখন সবাই চেয়ে আছে নিখোঁজ ছয় জেলের ভাগ্য কী হয় সেই দিকেই। সমুদ্রের বুকে তাঁদের খোঁজে এখনও তল্লাশি চলছে—একটি শেষ আশার আলোকে আঁকড়ে ধরে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন