প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী দালিয়ানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ শেষে দেশটির রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম চীন সফরের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফর বাংলাদেশ ও চীনের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বুধবার (২৪ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ের চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। স্টেশনে পৌঁছানোর পর চীনা কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এ সময় তাঁদের সম্মানে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়, যা দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংবর্ধনা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে চীনের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন দিয়াওইউতাই গেস্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। বেইজিং সফরকালে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী এবং সফরসঙ্গীরা এই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনেই অবস্থান করবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের আতিথেয়তার জন্য পরিচিত এই অতিথি ভবন দীর্ঘদিন ধরে চীনের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এর আগে স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৫৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দালিয়ান উত্তর রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাই-স্পিড বুলেট ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুতগতির এই রেলসেবা চীনের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক। দালিয়ান থেকে বেইজিং পর্যন্ত যাত্রাপথে প্রধানমন্ত্রী চীনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমিন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনিসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা। সফরসঙ্গীদের উপস্থিতি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এই সফরে কূটনীতি, অর্থনীতি, জ্বালানি, কর্মসংস্থান এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
বেইজিংয়ে পৌঁছানোর আগে প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’ সম্মেলনের বার্ষিক সভায় অংশ নেন। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ডালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার। গত কয়েক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্প খাতে দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, গত সোমবার মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সরকারি সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরসঙ্গীদের নিয়ে চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। মালয়েশিয়া সফরে তিনি দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই সফরের ধারাবাহিকতায় চীন সফরকে সরকার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়া ও চীনে এটি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ফলে এই সফর শুধু কূটনৈতিক দিক থেকেই নয়, বরং নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও লাল গালিচা সংবর্ধনা প্রদান বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্বেরই প্রতিফলন। আগামী দিনগুলোতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অংশীদারিত্বের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই সফর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।