আম রপ্তানিতে গতি আনতে বিমানভাড়া কমানোর দাবি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
  • ৬২ বার

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সুস্বাদু ও উচ্চমানের আম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমেই জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশের আমের চাহিদা বাড়লেও রপ্তানির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ বিমান পরিবহন ব্যয়। বিশেষ করে আম, লিচু, কাঁঠাল, ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন পচনশীল কৃষিপণ্য বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিমানভাড়া অত্যন্ত বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। এ পরিস্থিতিতে আমসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলমূল ও শাকসবজির রপ্তানি বাড়াতে বিমানভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে কমানোর দাবি জানিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।

এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। চিঠিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কৃষিপণ্য পরিবহনে বিমানভাড়া বেশি হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ভাড়া পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিমানভাড়া কমানো গেলে দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি কেজি আম বিদেশে পাঠাতে বিমানভাড়া বাবদ প্রায় ৫৮০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এই খরচ অত্যন্ত বেশি বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা। তাদের দাবি, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে একই ধরনের কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ তুলনামূলক অনেক কম। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়ে যাচ্ছে এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে আম উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ এবং দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত আমের স্বাদ ও গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশংসিত। সরকার অনুমোদিত উত্তম কৃষি চর্চা বা ‘গ্যাপ’ (Good Agricultural Practices) অনুসরণ করে উৎপাদিত আম বিদেশের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয়ের উচ্চহার রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মতিক্রমে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে প্রতি কেজি আম পরিবহনে ব্যয় অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত খরচ কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই বিমানভাড়া পুনর্বিবেচনা করে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বিমানভাড়া নয়, পচনশীল কৃষিপণ্য পরিবহনে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকাও একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা বা দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় রপ্তানি ব্যাহত হয়। ফলে উৎপাদক, রপ্তানিকারক এবং বৈদেশিক ক্রেতা—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়ে।

জানা গেছে, সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস প্রডিউসার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কাছে একটি আবেদন করা হয়। সংগঠনটির নেতারা তাদের আবেদনে উল্লেখ করেন, সরকার অনুমোদিত গ্যাপ পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম, ফলমূল এবং শাকসবজি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবহন ব্যয় নিশ্চিত করা জরুরি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে বিষয়টি পর্যালোচনার অনুরোধ জানিয়েছে।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করা হচ্ছে। কিন্তু বিমান পরিবহন ব্যয় এবং কাঁচা কৃষিপণ্য পরিবহনে অনীহার কারণে নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, ব্রুনাইসহ কয়েকটি সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও পরিবহনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে পণ্য পাঠানো সম্ভব হয়নি। এতে রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ফল, শাকসবজি ও সহযোগী পণ্য রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুরও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কাঁচা কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিমানভাড়া ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে তারা সরকারি ভর্তুকি ছাড়া নিজস্ব আয়ে পরিচালিত হয়। তবুও কৃষিপণ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবহন ব্যয় কমানোর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় কমানো গেলে দেশের কৃষক, রপ্তানিকারক এবং জাতীয় অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের আম, লিচু, পেয়ারা, কাঁঠাল, ড্রাগন ফল এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যপণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ যদি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে কৃষি রপ্তানি দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে। এজন্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কমানো, কার্গো সুবিধা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে তাই কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটির দিকে তাকিয়ে আছেন কৃষক, রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রত্যাশা, যৌক্তিক বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশের আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com