পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে নিহত ৩৬

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ৩ বার
পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে নিহত ৩৬

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের চালানো বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তালেবান সরকার। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৬৩ জন বেসামরিক নাগরিক। সোমবার (২৯ জুন) আফগান সরকারের এক মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাকিস্তান দাবি করেছে, তাদের অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা এবং হামলায় ২৫ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে এই হামলার ঘটনা ঘটল। আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে রাতের আঁধারে চালানো এই বিমান হামলা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। কাবুলের তালেবান প্রশাসন এটিকে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছে, আর ইসলামাবাদ বলছে, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন, পাকিস্তানের বিমান হামলায় হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, আফগান ভূখণ্ডে এ ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং এটি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।

হামলার পর আফগান সরকারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়েছে। তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের জনগণের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিবেচনা করবে।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বলছে, এই অভিযান ছিল নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন থেকে পরিচালিত। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, বিমান হামলার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় স্থল অভিযানও চালানো হয়েছে। অভিযানের লক্ষ্য ছিল জায়শ-উল-আহরার নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যা পাকিস্তানি তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে পরিচিত।

পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটিতে অবস্থান করে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলা চালানো সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে কাবুলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে আফগান কর্তৃপক্ষ বারবার দাবি করে আসছে, তারা তাদের ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে না।

২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর শুরুতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার আশা তৈরি হলেও সীমান্ত নিরাপত্তা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে দ্রুত মতবিরোধ বাড়তে থাকে।

গত কয়েক বছরে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার উত্তেজনা দেখা গেছে। সীমান্তে গোলাগুলি, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সামরিক তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতেও কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে, যা সম্পর্কের অবনতির নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

সোমবারের হামলার পরও পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের প্রভাব বহন করে আসছেন। যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, আবার অনেকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এই এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা দুই দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপরও আন্তর্জাতিক মহল গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি যেকোনো সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। কোনো অভিযান যদি সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে তা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে দেশটি কঠিন সময় পার করছে। এমন অবস্থায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাকিস্তান বলছে, তাদের লক্ষ্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিরোধ করা। অন্যদিকে আফগানিস্তান বলছে, নিজ ভূখণ্ডে এ ধরনের হামলা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ভবিষ্যতে সীমান্ত পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।

এই হামলার ঘটনায় নিহত ও আহতদের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক আবারও বড় ধরনের উত্তেজনার মুখে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত