লেবানন কি সত্যিই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিল?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার
লেবানন কি সত্যিই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিল?

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি কাঠামোগত (ফ্রেমওয়ার্ক) চুক্তি স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে—এই চুক্তির মাধ্যমে কি লেবানন ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে? বিভিন্ন মহলে এমন দাবি উঠলেও বাস্তব চিত্র বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

চুক্তিতে দুই দেশ দীর্ঘদিনের যুদ্ধাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। তবে এতে লেবাননের পক্ষ থেকে ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো ঘোষণা নেই। চুক্তির ভাষাতেও সরাসরি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধাবস্থা চলে আসছিল। যদিও দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধের ঘটনা সীমিত ছিল, তবে সীমান্ত সংঘাত, সামরিক অভিযান এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া নতুন এই চুক্তিতে দুই দেশ একে অপরের ‘শান্তিপূর্ণভাবে অস্তিত্ব থাকার অধিকার’ স্বীকার করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থার অবসানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে দীর্ঘদিনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে। কারণ যুদ্ধের অবসান এবং পারস্পরিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি অনেক সময় কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তিকে ‘শুরুরও শুরু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এটি কেবল একটি সমঝোতার শেষ নয়, বরং ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে লেবাননের অভ্যন্তরে এই চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিজবুল্লাহ এই চুক্তির বিরোধিতা করেছে। হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম চুক্তিটিকে ‘অকার্যকর ও বাতিল’ বলে মন্তব্য করেছেন।

লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরিও এই চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি লেবাননের অধিকার নিশ্চিত করে না এবং বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও নেই। তার এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে এখনো বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে।

লেবাননের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইসরাইলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন না করা। বর্তমানে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের মধ্যে লেবানন এখনো এমন একটি দেশ, যারা ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। একই অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও।

লেবাননের জনগণের একটি বড় অংশের কাছে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইতিহাস, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯৮২ সালে ইসরাইলের লেবানন অভিযান, দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি এবং পরবর্তী সংঘাতগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।

বিশেষ করে ২০০৬ সালের ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের স্মৃতি এখনো লেবাননের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সেই যুদ্ধের পর থেকেই ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

নতুন চুক্তির সমর্থকদের মতে, দীর্ঘদিনের সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তাদের যুক্তি, সীমান্তে উত্তেজনা কমলে লেবাননের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, এমন চুক্তি ভবিষ্যতে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাদের মতে, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো দেশের সঙ্গে শান্তি চুক্তি, যুদ্ধাবসানের ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি—এই তিনটি বিষয় এক নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেশগুলো সীমান্ত স্থিতিশীলতা বা সংঘাত বন্ধের জন্য চুক্তি করলেও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত পরে নেয়।

লেবানন ও ইসরাইলের বর্তমান চুক্তির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। এতে যুদ্ধাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তবে এই চুক্তি আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কগুলো নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। কাগজে থাকা একটি কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তাই সংক্ষেপে বলা যায়, লেবানন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে দুই দেশের মধ্যে নতুন এই চুক্তি ভবিষ্যতের সম্পর্কের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত