সর্বশেষ :

আমেরিকার মিত্র, তবে স্বাধীন সিদ্ধান্তে অটল মেলোনি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ১৪ বার
আমেরিকার মিত্র, তবে স্বাধীন সিদ্ধান্তে অটল মেলোনি

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তিনি বলেছেন, তিনি আমেরিকাবিরোধী নন, তবে কোনো দেশের সামনে ইতালি মাথা নত করবে না। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়েছেন, শক্তিশালী পশ্চিমা বিশ্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঐক্য প্রয়োজন।

ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেই মেলোনির এই মন্তব্য এসেছে। একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ইউরোপের রাজনীতিতে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভিষেক অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন মেলোনি। বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতির প্রশংসাও করেছিলেন তিনি।

তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের উষ্ণতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়। মেলোনি যুদ্ধের বিরোধিতা করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন, যা ওয়াশিংটনের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

সম্প্রতি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে সেই সম্মেলন ঘিরেই ট্রাম্প ও মেলোনির সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।

ইতালির রেতে ৪ চ্যানেলের ‘১০ মিনিট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেলোনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বলেন, “আমি আজ আমেরিকাবিরোধী নই, আবার গতকালও কারও সামনে নতজানু ছিলাম না।”

মেলোনি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন পশ্চিমা বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ থাকলে আরও শক্তিশালী হয়। তার মতে, একটি ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা জোটের মধ্যে ইতালি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তিনি বলেন, শক্তিশালী সম্পর্ক সবসময় পারস্পরিক সম্মান ও স্পষ্ট বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। নিজের অবস্থান তুলে ধরে মেলোনি জানান, তিনি সবসময় খোলামেলা ও স্পষ্টভাবে কথা বলার পক্ষে।

সম্প্রতি ট্রাম্পের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই নেতার মধ্যে প্রকাশ্য অস্বস্তি তৈরি হয়। জি-৭ সম্মেলনের সময় ইতালির একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মেলোনি তার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং বারবার অনুরোধ করেছিলেন।

ট্রাম্পের ওই মন্তব্যে ইতালির প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বিষয়টিকে ভিত্তিহীন গল্প হিসেবে উড়িয়ে দেন। মেলোনির ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করা হয়।

ঘটনার পর ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেন। এতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে সাময়িক উত্তেজনা আরও বাড়ে।

তবে পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে ট্রাম্প আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি দাবি করেন, মেলোনি নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য তার সঙ্গে ছবি তুলতে আগ্রহী ছিলেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে মেলোনি বলেন, তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কোনো বিদেশি নেতার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। ইতালির জনগণের স্বার্থ রক্ষায় তার অবস্থানই তার রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনির অবস্থান মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। একদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চান, অন্যদিকে ইতালির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও তুলে ধরতে চাইছেন।

ইতালি ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম বড় অর্থনীতি। ফলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেলোনির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইউরোপীয় স্বার্থ রক্ষাও একটি বড় রাজনৈতিক বিষয়।

ট্রাম্পের সঙ্গে মেলোনির সম্পর্ক শুরুতে অনেকটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। ইউরোপের অনেক নেতার তুলনায় তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। এ কারণেই তাকে অনেক সময় ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় নেতা হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক সংকট, বিশেষ করে যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির বিভিন্ন বিষয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য নতুন নয়। মেলোনির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মেলোনি একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। দ্বিতীয়ত, ইতালি নিজের জাতীয় স্বার্থ ও নীতিগত অবস্থানের ক্ষেত্রে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেবে।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও বাণিজ্য নীতির মতো বিষয়গুলোতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।

মেলোনির বক্তব্য সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তিনি স্পষ্ট করেছেন, পশ্চিমা ঐক্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই ঐক্য হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের নেতৃত্বের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বয়ের ওপর। তবে মেলোনির সাম্প্রতিক বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—ইতালি যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার থাকতে চায়, কিন্তু নিজের অবস্থান বিসর্জন দিয়ে নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত