প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি বর্তমান সময়ে নাগরিক জীবনের অপরিহার্য এক অনুষঙ্গ। ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি যেকোনো সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই কার্ডটি এখন মূল পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এই কার্ডটি নিয়ে জালিয়াতি এবং তথ্য পরিবর্তনের বিড়ম্বনা দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং অসাধু ব্যক্তিদের দ্বারা এনআইডি জালিয়াতির ঘটনা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন এবার জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় এক আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরির মাধ্যমে এনআইডি ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত এবং স্বচ্ছ করতে চায় কমিশন। এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে একজন ব্যক্তির ভোটার নিবন্ধনের সময় কেবল তার নিজের তথ্য নয়, বরং তার বাবা-মা এবং ভাই-বোনদের এনআইডি তথ্যও বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একজন নাগরিক যখন নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন করবেন, তখন তার পরিবারের সামগ্রিক তথ্যের একটি স্বচ্ছ চিত্র সার্ভারে সংরক্ষিত হবে। বর্তমানে কেবল পিতা ও মাতার এনআইডি তথ্য দিয়ে নিবন্ধনের যে বিধান রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে জালিয়াতির পথ উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। দালালচক্র এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে অসৎ উপায় অবলম্বন করে। নতুন ব্যবস্থায় পরিবারের ভাই-বোনদের এনআইডি নম্বর যুক্ত করা হলে সেই সুযোগ আর থাকবে না। কারণ, সার্ভারে সবার তথ্য যখন একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকবে, তখন কোনো অসাধু চক্র সহজেই পিতা-মাতার নাম পরিবর্তন বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার সাহস পাবে না। ভাই-বোনদের এনআইডি যাচাই করলেই সহজেই মূল তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং অসংগতি থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগের পেছনে নির্বাচন কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। অনেক সময় দেখা যায়, একটি পরিবারের ভাই-বোনদের এনআইডিতে পিতা-মাতার নামের বানানে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কোথাও বাবার নাম একটি, আবার কোথাও অন্যটি। কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিবারে এমন অসামঞ্জস্য থাকা মোটেও স্বাভাবিক নয় এবং কমিশন চায় একটি পরিবারের সবার এনআইডিতে তথ্য যেন অভিন্ন হয়। ভবিষ্যতে যদি কোনো পরিবারে এমন ভুল ধরা পড়ে, তবে তারা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে তা সংশোধনের আবেদন করতে পারবেন। কমিশন এই সংশোধন প্রক্রিয়াটি সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো আইনি জটিলতা বা ওয়ারিশ সংক্রান্ত বিরোধের সৃষ্টি না হয়।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবৈধভাবে ভোটার হওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নির্বাচন কমিশন আগেই কিছু বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। বিশেষ ফরমের মাধ্যমে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে ওই অঞ্চল থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি পাওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই চক্রগুলো এখন দেশের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন এই ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ব্যবস্থা কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সারা দেশের জন্য কার্যকর হবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশিরা যেমন ভুয়া এনআইডি তৈরির সুযোগ পাবে না, তেমনি দেশের নাগরিকরাও অনৈতিক কারণে তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। এটি এক ধরনের ডিজিটাল সুরক্ষা বলয় তৈরি করবে, যা জালিয়াতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে প্রায় ১৩ কোটির কাছাকাছি নাগরিকের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রায় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করতে কমিশনের সার্ভারের ওপর নির্ভরশীল। ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক বৃক্ষ ব্যবস্থা চালু হলে বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে মুহূর্তের মধ্যেই নিশ্চিত হতে পারবে। এতে করে সেবা গ্রহণে বিড়ম্বনা কমবে এবং প্রতিটি নাগরিকের পরিচয় আরও বেশি সুনির্দিষ্ট হবে। বিশেষ করে ওয়ারিশ সনদ প্রদানসহ উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো এই ডেটাবেজের মাধ্যমে খুব সহজেই সমাধান করা যাবে। নির্বাচন কমিশন মনে করছে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে এনআইডি সংশোধনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, যা নাগরিকদের ভোগান্তি লাঘবে বড় অবদান রাখবে।
নতুন ভোটারদের জন্য এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ মনে হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের নাগরিকত্ব ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে। সাধারণ ক্ষেত্রে এনআইডি পাওয়ার জন্য নাম, জন্মসনদ, শিক্ষাগত সনদ এবং ইউটিলিটি বিলসহ নানাবিধ কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের প্রত্যয়নপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র যাচাইয়ের কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এখন ‘ফ্যামিলি ট্রি’ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই যাচাই প্রক্রিয়াটি আরও গভীরতর হবে। যদিও বিষয়টি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের পর্যালোচনাধীন রয়েছে, তবে এটি চূড়ান্ত হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিশেষে, ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এনআইডির স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশনের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত কেবল জালিয়াতি রোধ করবে না, বরং প্রতিটি পরিবারকে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসবে। এটি নাগরিকদের জন্য একদিকে যেমন বাড়তি তথ্যের দায়বদ্ধতা তৈরি করবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে তাদের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্তি দেবে। প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যের এই সমন্বয় নিশ্চিত করার ফলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের পরিচয় আরও বেশি সুরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য হবে, যা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় একটি শক্তিশালী ভিত হিসেবে কাজ করবে।