প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিচারিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের প্রচলিত পোশাকবিধি বা ড্রেস কোডে এক বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। তীব্র গরম ও আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কথা বিবেচনা করে দেশের সব অধস্তন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও আইনজীবীদের জন্য পোশাকের নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচার শাখা থেকে জারিকৃত এই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আজ বুধবার থেকে বিচারিক কার্যক্রমে কালো কোট পরার বাধ্যবাধকতা আর থাকছে না। আবহাওয়ার পরিবর্তন ও বিচারক-আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বিচারিক কার্যক্রমকে আরও আরামদায়ক ও গতিশীল করার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধস্তন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালসমূহের বিচারকরা এখন থেকে গাউন এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাদা ফুলশার্ট অথবা সাদা শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে সাদা নেক ব্যান্ড পরিধান করবেন। তবে তাদের জন্য কালো কোট পরিধানের যে দীর্ঘকালীন বাধ্যবাধকতা ছিল, তা আপাতত তুলে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও একই ধরণের শিথিলতা আনা হয়েছে। তারা এখন সাদা ফুলশার্ট অথবা সাদা শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে সাদা নেক ব্যান্ড অথবা কালো টাই পরিধান করতে পারবেন। তাদের জন্যও কালো কোট ও গাউন পরিধান করা বাধ্যতামূলক নয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। প্রধান বিচারপতির আদেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন।
এই নতুন নিয়ম আজ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী কোনো নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এটি বলবৎ থাকবে। দেশের সব জেলা ও দায়রা জজ, মহানগর দায়রা জজ, বিভিন্ন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল এবং শ্রম আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সব বিচারিক প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আদালত অঙ্গনে দীর্ঘ দিন ধরে এই পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন আইনজীবীরা। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরমে কালো কোট ও গাউন পরে দীর্ঘ সময় এজলাসে দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করা বিচারক ও আইনজীবীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। অনেক ক্ষেত্রে গরমের তীব্রতা বিচারিক কাজের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকেও ব্যাহত করত। সুপ্রিম কোর্টের এই নমনীয় সিদ্ধান্তকে তাই বিচারিক সংশ্লিষ্টরা স্বাগত জানিয়েছেন।
আইনি পেশায় পোশাকের একটি বিশেষ গাম্ভীর্য ও মর্যাদা রয়েছে, যা শতাব্দী প্রাচীন ব্রিটিশ আমলের প্রথা থেকে চলে আসছে। তবে যুগের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে অনেক উন্নত দেশেই এখন বিচারিক পোশাকে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কালো কোট ও গাউন পরিধানের রীতিটি দীর্ঘকাল ধরে বিচারিক শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে টিকে ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কালো রঙের পোশাক পরে দীর্ঘক্ষণ আদালতে অবস্থান করা স্বাস্থ্যসম্মত কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন মূলত মানবিক দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। পোশাকের এই শিথিলতা বিচারকদের স্বাচ্ছন্দ্যে এজলাস পরিচালনা করতে সাহায্য করবে এবং আইনজীবীরাও তাদের তর্কের সময় আরও স্বস্তিবোধ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পোশাকবিধির এই পরিবর্তন কেবল একটি রুটিন মাফিক আদেশ নয়, বরং এটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং আদালতের পরিবেশকে আরও আধুনিক করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। বিচারক ও আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের কর্মঘণ্টা এবং তাদের কাজের তীব্র চাপের কথা বিবেচনা করলে এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আদালতের পবিত্রতা ও গাম্ভীর্য কেবল কালো কোটের ওপর নির্ভর করে না, বরং সেটি নির্ভর করে আইনের শাসনের সঠিক প্রয়োগ ও পেশাদারিত্বের ওপর। নতুন পোশাকবিধি সেই গাম্ভীর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল কর্মপরিবেশকে সহনীয় করে তুলবে।
তবে এই পরিবর্তনে পোশাকের রঙ ও কাঠামোর ওপর যে নজর রাখা হয়েছে, তা প্রশংসার যোগ্য। বিচারিক মর্যাদা ও আভিজাত্য বজায় রাখার স্বার্থে সাদা শার্ট এবং নেক ব্যান্ডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে, যা আদালত অঙ্গনের পরিচ্ছন্নতা ও গাম্ভীর্যকে নিশ্চিত করে। কালো কোট বাদ দিলেও আইনজীবীদের কালো টাই ব্যবহারের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা পেশাগত পরিচয় ও আভিজাত্যকে ধরে রাখারই একটি কৌশল। সব মিলিয়ে, বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পথে সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন নির্দেশনা কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি বিচারিক কর্মপরিবেশে এক মানবিক পরিবর্তনের মাইলফলক। এখন থেকে বিচারকরা এবং আইনজীবীরা কিছুটা স্বস্তিতে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, যা পরোক্ষভাবে বিচারপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত ও কার্যকর বিচারিক সেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।