প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলো কেবল ভৌগোলিক সীমানা বা কাঁটাতারের বেড়াজাল দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। সময়ের বিবর্তনে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা আজ আমূল বদলে গেছে। ডিজিটাল বিপ্লব এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের ফলে নিরাপত্তার নতুন এক অদৃশ্য রণাঙ্গন তৈরি হয়েছে, যাকে আমরা সাইবার জগত বলছি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আজ বুধবার সকালে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এক যুগান্তকারী মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অফিশিয়াল মিডিয়া সেল ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার সীমান্ত পাহারা দেওয়ার চেয়েও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তার এই বক্তব্য জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিশারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণার বাইরে এসে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এক সময় দেশ ও জাতি রক্ষায় কেবল স্থল সীমান্ত পাহারা দেওয়াই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আজকের যুগে তথ্যই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি। আর এই তথ্য যদি ভুল হাতে পড়ে বা গুজব তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে তা দেশের অখণ্ডতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মন্ত্রী আনসার বাহিনীকে তাদের প্রথাগত ধারার বাইরে এসে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর’-এর যাত্রা কেবল একটি মিডিয়া সেলের উদ্বোধন নয়, বরং এটি সঠিক তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার এবং গুজব প্রতিরোধে একটি কার্যকর ডিজিটাল অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে।
সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব অনুধাবন করার অর্থ হলো ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেকে প্রস্তুত রাখা। আজকের যুগে একটি রাষ্ট্র কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত হয় না, বরং ভুল তথ্য বা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমেও দেশের ভেতরের সামাজিক শৃঙ্খলা ধসে দেওয়া সম্ভব। সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন উপায়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ডেটাবেজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় আঘাত হানার চেষ্টা করে। এই হুমকিগুলো সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মতো স্পষ্ট নয়, এগুলো অনেক বেশি জটিল এবং অদৃশ্য। তাই তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিনির্ভর কোনো বিষয় নয়, এটি সরাসরি দেশের সার্বভৌমত্বের সাথে যুক্ত। বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা সময়ের দাবি।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো তৃণমূল পর্যায়ের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীকে যখন প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে, তখন এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে বলে আশা করা যায়। সারা দেশে আনসার বাহিনীর বিশাল নেটওয়ার্ক তৃণমূলের তথ্য প্রবাহে বড় ভূমিকা পালন করে। এখন যদি এই বাহিনী ডিজিটাল সচেতনতা এবং সাইবার সুরক্ষায় সক্রিয় হয়, তবে গুজব প্রতিরোধ করা অনেক সহজ হবে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মনে করেন, তথ্যই যখন বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, তখন সেই অস্ত্রটি যেন গুজব ও অপপ্রচারের শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই মূল দায়িত্ব। আনসার বাহিনীর ফেসবুক পেজ ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর’ মানুষের কাছে সঠিক সংবাদ পৌঁছানোর পাশাপাশি সাইবার অপরাধের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রথাগত নিরাপত্তার সাথে সাইবার নিরাপত্তার এই মেলবন্ধন বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক। উন্নত রাষ্ট্রগুলো অনেক আগে থেকেই তাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সীমান্ত সুরক্ষার সমান গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তথ্যমন্ত্রীর এই অনুধাবন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ সরকার এখন জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও সাইবার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এটি কেবল কোনো বিশেষ বাহিনীর বিষয় নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বাড়াতেও সহায়ক হবে। আমরা যদি আমাদের ডিজিটাল সীমানাকে সুরক্ষিত রাখতে পারি, তবেই কেবল প্রকৃত স্বাধীনতা ও প্রগতি বজায় রাখা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, সীমান্ত পাহারা দেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য যেমন অপরিহার্য, সাইবার নিরাপত্তাও তেমনি অত্যাবশ্যক। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের এই বক্তব্য জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ তৈরি করেছে। একটি সমৃদ্ধ ও সুরক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের যেমন স্থল ও জলসীমা পাহারা দিতে হবে, তেমনি ডিজিটাল জগতকেও রাখতে হবে নিরাপদ ও কলুষমুক্ত। ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো যখন সঠিক তথ্যের প্রচার করবে, তখন গুজব বা অপপ্রচার সহজেই মুখ থুবড়ে পড়বে। এটিই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান চাবিকাঠি। আনসার বাহিনীর এই নতুন পথচলা দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও এক ধাপ শক্তিশালী করবে এবং একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।