বাঞ্ছারামপুরে ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য, থানায় জিডি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
বাঞ্ছারামপুরে ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য, থানায় জিডি

প্রকাশ: ০১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভূমি অফিসের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি শক্তিশালী দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের সেবাগ্রহীতারা। নামজারি ও জমাখারিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সেবা পেতে এসে প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে অনেককেই গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এই অসাধু চক্রের লাগাম টেনে ধরতে এবং জনমনে স্বস্তি ফেরাতে বুধবার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেখানে নামজারি ও জমাখারিজের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া এখন অনলাইনে পরিচালিত হয়, সেখানে দালালদের এমন অবাধ বিচরণ ও অর্থ আদায়ের ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী ই-নামজারি ও জমাখারিজের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার নগদ লেনদেনের সুযোগ নেই। আবেদন ফি হিসেবে ৭০ টাকা এবং অনুমোদন ফি হিসেবে ১১০০ টাকা—অর্থাৎ মোট ১১৭০ টাকা সরকারি কোষাগারে অনলাইনে জমা দিতে হয়। এরপর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিন্তু একটি অসাধু চক্র উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়ন পর্যায়ে সাধারণ মানুষদের ভুল বুঝিয়ে প্রলুব্ধ করছে। তারা দাবি করছে, তাদের মাধ্যমে আবেদন করলে দ্রুত নামজারি অনুমোদন করিয়ে দেওয়া সম্ভব। আর এই মিথ্যা আশ্বাসের বিনিময়ে চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রবিউল হাসান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা ভূমি অফিস শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে নাগরিকদের সেবা প্রদান করে আসছে। ই-নামজারি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট করতে এবং সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে দালাল চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ভূমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সাথে এই প্রতারক চক্রের বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং তারা অফিসের সুনাম নষ্ট করছে এবং সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে। এই চক্রটিকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। প্রতারকদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন তিনি।

ভূমি সেবার এই জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্রটি সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিচ্ছে। বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার বাসিন্দা কৃষক মো. আজাদ মিয়া জানিয়েছেন, তিনি কোনো দালালের সাহায্য ছাড়াই সরকারি নিয়ম মেনে মাত্র ১১৭০ টাকা ফি দিয়ে নিজের জমি খারিজ করতে পেরেছেন। তার মতো সচেতন নাগরিকরা যদি নিয়ম মেনে চলেন, তবে দালালের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। কিন্তু অধিকাংশ সেবাগ্রহীতা অনলাইনে আবেদনের জটিলতা না বোঝার কারণে দালালদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। প্রতারক চক্রটি সাধারণত এমন ব্যক্তিদেরই টার্গেট করে যারা ভূমি অফিসের দাপ্তরিক কাজের দীর্ঘসূত্রতা বা জটিলতা নিয়ে আতঙ্কিত থাকে।

প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে প্রশাসন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ জানিয়েছেন, যদি কেউ তাদের কাছে নামজারি করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতিরিক্ত কোনো টাকা দাবি করে, তবে যেন সরাসরি ভূমি অফিসে যোগাযোগ করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং অসাধু চক্রটিকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। ভূমি সেবা পেতে যেন সাধারণ মানুষকে কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

বাঞ্ছারামপুর ভূমি অফিসের এই সাহসী পদক্ষেপকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার যখন সব জটিলতাকে সহজ করে দিচ্ছে, তখন দালালদের এই ধরনের কর্মকাণ্ড আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, বাঞ্ছারামপুর থানার জিডির প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুব দ্রুত এই চক্রের মূল হোতাদের খুঁজে বের করবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করবে। জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলা এড়াতে এবং দালালের খপ্পর থেকে বাঁচতে এখন থেকে ভূমি অফিসের প্রতিটি সেবা সরাসরি সরকারি পোর্টাল বা অফিসের মাধ্যমে গ্রহণ করাই শ্রেয়।

প্রশাসন মনে করছে, কেবল আইন প্রয়োগ করে নয়, বরং নিয়মিত প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল ভূমি সেবা সম্পর্কে আস্থার জায়গাটি পোক্ত করতে হবে। বাঞ্ছারামপুর ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং তারা নাগরিকদের অনুরোধ করেছেন যেন কোনো অসাধু ব্যক্তি বা চক্রের প্রলোভনে পড়ে প্রতারিত না হন। ভূমি সেবা এখন হাতের মুঠোয়, এটি যদি প্রকৃত অর্থে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তবেই দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হবে। বাঞ্ছারামপুর থেকে শুরু হওয়া এই আইনি লড়াই দেশের অন্যান্য ভূমি অফিসগুলোতেও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত