প্লাস্টিক শিল্পে সংকট: বন্ধ তিনশ কারখানা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
প্লাস্টিক শিল্পে সংকট: বন্ধ তিনশ কারখানা

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির নাজুক প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের উদীয়মান প্লাস্টিক শিল্প খাতে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম এবং দেশীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চিত সরবরাহ ব্যবস্থা এই শিল্পকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত পিভিসি রেজিন, পলিপ্রোপাইলিন, পলিইথিলিন এবং পিইটি রেজিনের দাম অস্বাভাবিকভাবে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের যাঁতাকলে পড়ে দেশের প্রায় ৩০০টি প্লাস্টিক কারখানা ইতিমধ্যেই তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, যা শিল্পখাতে এক ভয়াবহ সংকেত দিচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় সংগঠনের সভাপতি শামীম আহমেদ এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সিনিয়র সহসভাপতি কে এম ইকবাল হোসেনসহ অন্য নেতারা। সভাপতি জানান, কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় শিল্পমালিকরা পিষ্ট হচ্ছেন। বাড়তি এই ব্যয়ভার সমন্বয় করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে প্লাস্টিক পণ্যের দাম ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে। তবে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাইলেই সব পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে উৎপাদকদের একটি বড় অংশ লোকসানের বোঝা টানতে টানতে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় প্লাস্টিক খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ইনজেকশন মোল্ডিং, ব্লো মোল্ডিং ও এক্সট্রুশনভিত্তিক কারখানাগুলো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা স্থবির হয়ে থাকছে। শামীম আহমেদ জানান, ঢাকা মহানগরীর এলাকাভেদে আধাঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা এবং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এক থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। এই অনিশ্চয়তার ফলে বেশিরভাগ কারখানায় উৎপাদন ক্ষমতা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। ছোট ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের কারখানাগুলোর নিজস্ব জেনারেটর ব্যবহারের সক্ষমতা না থাকায় তারা শতভাগ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় তাদের কারখানায় সম্পূর্ণ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

শিল্প মালিকদের জন্য বর্তমান সময়টি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা এগিয়ে আসছে, বাড়ছে বিদ্যুৎ বিল ও কারখানার দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশগুলো সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্রেতা সঠিক সময়ে পণ্য হাতে না পাওয়ায় তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করছেন, যা উদ্যোক্তাদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপিজিএমইএ সভাপতির মতে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সহায়তা এবং সহজ শর্তে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের জন্য সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানান তিনি।

তবে এই সংকটের অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্লাস্টিক শিল্পের জন্য বেশ কিছু কর ও শুল্ক সুবিধা বহাল রাখাকে তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। পিভিসি রেজিন, পিইটি রেজিন এবং ফিল্ম গ্রেড পিইটি রেজিনের ওপর আগের শুল্ক কাঠামো বজায় রাখা হয়েছে, যা কাঁচামালের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছুটা সাহায্য করবে। এছাড়া ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকেও তারা সাধুবাদ জানিয়েছেন। প্রস্তুত প্লাস্টিক পণ্যে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা এবং কেমিক্যাল টেস্টের প্রক্রিয়া সহজীকরণের সিদ্ধান্ত শিল্প মালিকদের মনে কিছুটা স্বস্তি এনেছে।

রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রেও সরকার কিছু জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রিসাইক্লিং পণ্যের ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখা এবং রিসাইক্লিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ওয়েস্ট বা বর্জ্য সরবরাহে উৎসে কর কমানোর সিদ্ধান্তকে প্লাস্টিক শিল্প মালিকরা অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এটি পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার দিকে দেশকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে বলে তাদের বিশ্বাস। তবে কেবলমাত্র শুল্ক সুবিধাই যথেষ্ট নয়, বরং শিল্পকারখানা সচল রাখতে হলে যে মৌলিক পরিকাঠামোর প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, যা জাতীয় রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট হয়তো বৈশ্বিক, কিন্তু এর প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য দেশীয় উদ্যোক্তাদের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। ৩০০টি কারখানার বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর বেদনাদায়ক বাস্তব। সরকার ও ব্যবসায়ী নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ নজর দিলে এই খাতের হারানো গৌরব পুনরায় ফিরে পাওয়া সম্ভব। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই শিল্পের সংকট উত্তরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত