না ফেরার দেশে আফগান পেসার শাপুর জাদরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
না ফেরার দেশে আফগান পেসার শাপুর জাদরান

প্রকাশ: ০৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ক্রিকেট মাঠের সেই পরিচিত দীর্ঘদেহী মানুষটি আর নেই। যার গতির ঝড় আর লম্বা ঝাঁকড়া চুলে অদম্য যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি দেখা যেত, সেই শাপুর জাদরান এখন শুধুই স্মৃতি। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আফগানিস্তান ক্রিকেটের শুরুর দিকের অন্যতম আইকনিক তারকা। দীর্ঘদিন ধরে এক বিরল ও প্রাণঘাতী রোগের সঙ্গে লড়াই করার পর ভারতের নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রতিভাবান ক্রিকেটার। তার প্রয়াণের খবরে পুরো ক্রিকেট বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক একদিন আগে তার এই অকাল মৃত্যু আফগান ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

গত বছরের অক্টোবর থেকে শাপুর জাদরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। নিজ দেশে অসুস্থ বোধ করার পর তার ভাই ঘামাই জাদরান এবং সাবেক অধিনায়ক আসগর আফগান তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যান। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে তিনি দিল্লির একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি ‘হিমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস’ (এইচএলএইচ) নামক এক অত্যন্ত বিরল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নিজের শরীরের সুস্থ কোষ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রমণ শুরু করে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে একটি ভয়ংকর সংক্রমণ, যা তার শরীরের অন্যান্য অংশে এবং মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়েছিল। মাঝে একবার উন্নতির লক্ষণ দেখা দিলেও শেষ রক্ষা আর হলো না।

আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি) তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে এক আবেগঘন বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, শাপুর জাদরান ছিলেন আফগান ক্রিকেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারীদের একজন। তার আবেগ, নিবেদন এবং ক্রিকেটের প্রতি অটুট প্রতিশ্রুতি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মাঠে বল হাতে গতির ঝড় তোলার পাশাপাশি শাপুর ছিলেন মাঠের বাইরে এক অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব। তরুণ আফগান ক্রিকেটারদের কাছে তিনি ছিলেন বড় স্বপ্ন দেখার এক বাতিঘর। তার লড়াইয়ের মানসিকতা এবং অদম্য জেদ বহু অসাধ্য সাধনের শক্তি জুগিয়েছে আফগানিস্তান দলকে।

শাপুর জাদরানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও আবেগঘন মুহূর্তটি ধরা আছে ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে। নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে শেষ ওভারে জয়ের জন্য যখন আফগানিস্তানের দরকার ছিল একটি রান, তখন ক্রিজে ছিলেন এই পেসার। স্নায়ুচাপের সেই মুহূর্তটিতে তিনি স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে বল ঠেলে দিয়ে যখন জয়সূচক রানটি নিলেন, তখন পুরো মাঠের উল্লাস ছিল দেখার মতো। দুই হাত ছড়িয়ে শাপুরের সেই দৌড় আর সতীর্থদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠা আনন্দ অশ্রু বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে। সেই জয়ের মাধ্যমেই আফগানিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জয়ের স্বাদ পেয়েছিল, যার নেপথ্যে ছিলেন এই লড়াকু ক্রিকেটার।

২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে শাপুর জাদরান আফগানিস্তানের জার্সিতে ৪৪টি ওয়ানডে ও ৩৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার বোলিং অ্যাকশন এবং রানআপ ছিল যে কোনো ব্যাটারের জন্য ভয়ের কারণ। লম্বা চুল উড়তে উড়তে যখন তিনি উইকেটের দিকে ছুটে আসতেন, তখন মনে হতো যেন কোনো অদম্য ঝড়ের গতিতে বল ছুড়ছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ২০২২ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন তিনি এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট থেকে বিদায় জানান। দীর্ঘ ২২ বছরের এই বর্ণিল যাত্রা আজ থেমে গেল বিষাদময় সমাপ্তিতে।

তার ভাই ঘামাই জাদরান জানান, চিকিৎসা চলাকালে শাপুর অত্যন্ত যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন। সংক্রমণের প্রকোপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে হার মানিয়ে তার মস্তিষ্ক পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। তিন সপ্তাহ হোটেলে থেকে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরেছিলেন তিনি, কিন্তু সেই আশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সংক্রমণ আবার ফিরে এলে তাকে পুনরায় আইসিইউতে নেওয়া হয়, সেখান থেকেই তার চিরবিদায়ের বার্তা এলো। একজন অদম্য ক্রিকেটারের জীবনপ্রদীপ এভাবে নিভে যাওয়ায় শোকস্তব্ধ তার ভক্ত, সতীর্থ ও পরিবার।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই ক্ষণজন্মা ক্রিকেটারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। শাপুর জাদরান কেবল একটি নাম নন, তিনি আফগান ক্রিকেটের জাগরণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সাহসিকতা, বিনয় এবং মাঠের লড়াইয়ের মানসিকতা চিরকাল বেঁচে থাকবে ক্রিকেটের ইতিহাসপটে। এই অকাল মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের চরম বাস্তবতা এবং শরীরের লড়াইয়ের সীমাবদ্ধতা। ক্রিকেটপ্রেমী প্রতিটি মানুষ আজ তার স্মৃতিচারণ করছেন এবং তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছেন। শাপুর জাদরান নেই, কিন্তু তার সেই ঐতিহাসিক জয়ের মুহূর্ত আর মাঠের সেই অদম্য ঝড়ের গতি ক্রিকেট ইতিহাসে বারবার ফিরে আসবে নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত