প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপির সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মি. ইয়াও ওয়েন এবং তার প্রতিনিধিদল বিরোধীদলীয় নেতার মিন্টো রোডের বাসভবনে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেশটির দূতাবাসের রাজনৈতিক সেকশনের পরিচালক ঝ্যাং জিং এবং পলিটিক্যাল অ্যাটাশে মি. রু কি উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য উভয় পক্ষই ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ডা. শফিকুর রহমান আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিল্পায়নে চীনের ধারাবাহিক বিনিয়োগের প্রশংসা করেন তিনি। অন্যদিকে চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা। তিস্তা নদী কেন্দ্রিক এই বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্পটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদলীয় নেতা এই প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও এতে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর (সিএমবিসি) নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই করিডরটি বাস্তবায়িত হলে তা কেবল বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে দুই পক্ষই মত প্রকাশ করে। এই করিডরকে ঘিরে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে দুই দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গা সংকট ছিল এই বৈঠকের একটি সংবেদনশীল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানের জন্য চীন সরকারের সক্রিয় ও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বছরের পর বছর ধরে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ওপর এক বিশাল আর্থ-সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে। চীন যেহেতু মিয়ানমারের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, তাই এই সংকট সমাধানে চীন সরকারের কূটনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী কাম্য। রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতা ও বাংলাদেশের উদ্বেগের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং এই সমস্যার সমাধানে চীন সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গঠনমূলক ভূমিকার আশ্বাস প্রদান করেন।
এছাড়া বাংলাদেশে চলমান চীনের বিনিয়োগ এবং প্রস্তাবিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চলে। বর্তমানে চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে যা দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে বিশাল প্রভাব ফেলছে। বিরোধীদলীয় নেতা উন্নয়নের এই ধারাকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। চীনা রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় চীনের বিনিয়োগকারীরা আরও আগ্রহী এবং বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকলে ভবিষ্যতে এই ধারা আরও বিস্তৃত হবে। উভয় পক্ষই আশা ব্যক্ত করে যে, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কেবল দুই দেশের সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণেও নিবেদিত হবে।
বৈঠকটি অত্যন্ত গঠনমূলক ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে একজন প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূতের এই ধরণের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বাংলাদেশের বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাত ও খোলামেলা আলোচনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্র নীতিতে সব দেশের সঙ্গে সমান গুরুত্ব বজায় রেখে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে আগ্রহী। চীনের রাষ্ট্রদূত মি. ইয়াও ওয়েন বিরোধীদলীয় নেতার আতিথেয়তায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত এ ধরনের আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার ইচ্ছা পোষণ করেন।
পরিশেষে বলা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, সিএমবিসি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে এই আলোচনা আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সচেতন মহল। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল যে দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সজাগ ও দায়িত্বশীল, এই বৈঠকের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই নতুন গতিধারার প্রতি সতর্ক নজর রাখছে। আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক সম্মান ও সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগামীতে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।