প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্রমূর্তির কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চীন। টাইফুন মায়সাকের প্রভাবে সৃষ্ট টানা ভারি বর্ষণ, ভয়াবহ বন্যা এবং একের পর এক ভূমিধসে দেশটির বিশাল এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ ও আহত হয়েছেন আরও অনেকে। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংসি থেকে শুরু করে মধ্যাঞ্চলের হুবেই এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গানসু প্রদেশ পর্যন্ত এই দুর্যোগের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতই ব্যাপক যে, তা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্ধারকারী দলগুলো।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংসি অঞ্চলে টাইফুনের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এই অঞ্চলের প্রায় ৪০টিরও বেশি নদী ও পানিপথ এখন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে। প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কৃষিজমির ওপর এই বন্যার আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে; প্রায় ১৩ হাজার একর কৃষিজমি এখন পানির নিচে, যা স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির সম্প্রচারিত ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, একটি জলাধারের কংক্রিটের বাঁধ ভেঙে পানির প্রবল স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাবারের নৌকায় চড়ে আটকাপড়া মানুষদের উদ্ধারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
গুয়াংসি অঞ্চলের পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার জরুরি সতর্কতা বহাল রেখেছে। পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোইং সতর্ক করে বলেছেন যে, উঝৌ জলপরিমাপ কেন্দ্রে নদীর পানি বিপৎসীমার ছয় মিটারেরও বেশি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। টানা বৃষ্টির ফলে জলাধার ও বাঁধগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য, রেইনকোট এবং উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় নৌকা ও সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধারকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে মধ্যাঞ্চলের হুবেই প্রদেশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানে বজ্রঝড় ও প্রবল বেগের বাতাসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৩১ জন। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে প্রায় ৪ হাজার ৮০০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২২টি স্থাপনা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। একজন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যার সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। প্রকৃতির এই তাণ্ডব মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার পাশাপাশি জনজীবনকে সম্পূর্ণ স্থবির করে দিয়েছে। হুবেইয়ের বাসিন্দারা এখন খোলা আকাশের নিচে অথবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একই সময়ে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গানসু প্রদেশে ঘটেছে মর্মান্তিক ভূমিধসের ঘটনা। দাংচাং কাউন্টির রেনচাং গ্রামে মঙ্গলবার ভোরে আকস্মিক এক ভূমিধসে ৩৩ জন মানুষ মাটির নিচে চাপা পড়েছিলেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর উদ্ধারকর্মীরা ২১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। এই এলাকায় ভূমিধসের কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ দল কাজ শুরু করেছে এবং অঞ্চলটির পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য সরকার ৩ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দিয়েছে। মাটির নিচে চাপা পড়া মানুষের স্বজনদের আর্তনাদে সেখানকার বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর খেলায় মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন গ্রামগুলো এখন শোকার্ত উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
এই দুর্যোগের মানবিক দিকটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একদিকে বন্যার পানি ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে ভূমিধসে চাপা পড়ছে মানুষের স্বপ্নের নীড়। অনেক পরিবার তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা কাঁদা আর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যখন একে একে মৃতদেহ উদ্ধার করছেন, তখন সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। সরকারি সহায়তা পৌঁছালেও পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা। দুর্যোগকবলিত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে।
চীনের এই বন্যা ও ভূমিধস কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ বার্তা। অস্বাভাবিক আবহাওয়া, অকাল বন্যা এবং ভূমিধসের মতো দুর্যোগগুলো এখন বিশ্বজুড়ে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চীনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় সরকারগুলো এখন জলাধারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোইং স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে থাকার কারণে আগামী কয়েকদিন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই বাঁধ ও জলাধারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, চীনের এই সংকটময় সময়ে বিশ্ববাসী শোকাহত। উদ্ধার অভিযান শেষে আহতদের চিকিৎসা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কিছুটা হলেও আশা জাগাচ্ছে। টাইফুন মায়সাক চলে গেলেও এর ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে চীনের জনপদে। শোকস্তব্ধ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন জীবন গড়ার লড়াই এখন দেশটির প্রধান চ্যালেঞ্জ। শি জিনপিংয়ের নির্দেশে পরিচালিত এই বিশাল উদ্ধারযজ্ঞ এবং ত্রাণ কার্যক্রম যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবেই হয়তো এই দুর্গত মানুষগুলো নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে। প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের কাছে মানুষ পরাজিত নয়, বরং প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করেই টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাই চীনের মানুষের বড় শক্তি।