প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিগত সরকারের সময়কার নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে সরব হয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘আত্মোপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনায় অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দীপ্ত শপথ’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টি। সভায় বক্তারা সাবেক সরকারের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচনের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন অভিযোগ করেন যে, দেশে আবারও এক ধরনের গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। হঠাৎ করেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কালেমা লেখা পতাকা সম্বলিত ব্যানার টানানোর মাধ্যমে জঙ্গিবাদের নাটক সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বিগত সরকার যখনই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নড়বড়ে মনে করত, তখনই তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশে জঙ্গিবাদ আছে বলে একটি সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করত। বর্তমান সময়েও সেই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। দেশের মানুষকে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর নাটক ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ড. রিপন বলেন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই, কারণ তাঁর শাসনামলে সংঘটিত রক্তপাতের দাগ তাঁর হাতে লেগে আছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে ড. রিপন বলেন, ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী কাঠামো মাত্র চার মাসে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ দীর্ঘ ও কঠিন পথ। তবে বাংলাদেশ সেই পথেই এগোচ্ছে। তিনি পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, রাতারাতি কোনো পরিবর্তন আসে না, বরং ধীরে ধীরে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যে লক্ষ্য ও স্বপ্ন নিয়ে দেশের মানুষ জুলাই মাসে রাজপথে নেমেছিল, আমরা তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারিনি। জুলাই সনদ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। এক পক্ষ দাবি করছে সনদ বাস্তবায়নের কথা, অন্য পক্ষ বলছে বিশ্বাসঘাতকতার কথা। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো জানে না, কবে এবং কীভাবে এই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। মানুষের জীবন বদলের জন্য যে রূপরেখা জুলাই সনদে ছিল, তার একটিও এখনো দৃশ্যমান হয়নি। উল্টো বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, যা জনগণের প্রত্যাশার সাথে সাংঘর্ষিক।
মাহমুদুর রহমান মান্না আরও বলেন, জুলাইয়ের চেতনা শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি ডাক। স্বাধীনতার পর যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ম্লান হয়ে গিয়েছিল, দুই বছর পার হলেও জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জুলাইয়ের দাবিগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতিও স্বচ্ছ হতে হবে। সৎ পথে চলা এবং সত্যকে আগলে রাখার মাধ্যমে জুলাইয়ের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের প্রবল আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের অবসান এবং একটি সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্যই তরুণরা সেদিন জীবন দিয়েছিল। তিনি তরুণ প্রজন্মের ঐক্যের প্রশংসা করে বলেন, যখন দেশের তরুণরা ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তাদের কোনো শক্তিই থামিয়ে রাখতে পারে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি আদালতের রায় নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। জনগণ এই রায় ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটেই দিয়ে দিয়েছিল। এখন সেই জনরায়কে কার্যকর করা সময়ের দাবি। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন যেন শুধুমাত্র আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থাকে, সেদিকেও তিনি নজর দেওয়ার অনুরোধ করেন। জনরায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে কোনো দীর্ঘসূত্রতা জনগণ মেনে নেবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, নানামুখী অদৃশ্য শক্তি জুলাইয়ের চেতনাকে অপমান ও অপদস্থ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা এই অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না। তিনি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসাইনের সঞ্চালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন জুলাই অভ্যুত্থানে সর্বকনিষ্ঠ শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। তিনি অশ্রুসজল কণ্ঠে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দাবি জানান। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, ডা. আবদুল ওহাব মিনার, ফারাহ নাজ, শহীদ আরাফাত হোসেনের বড় ভাই হাসান আলী এবং সাংবাদিক সালাউদ্দীন বাবলু।
পরিশেষে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের কাজ চলমান থাকবে। কোনো ষড়যন্ত্রই যেন এই যাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে, সেজন্য সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে একতাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়। জঙ্গিবাদ বা অন্যান্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার যে নীল নকশা দেখা যাচ্ছে, তা নস্যাৎ করতে জনগণের সতর্কতার বিকল্প নেই। এই আলোচনা সভার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিকরা পুনরায় জুলাইয়ের সেই অপরাজেয় চেতনার জয়গান গাইলেন।