প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের সাংগঠনিক ভিতকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন ও গুছিয়ে আনার কার্যক্রম ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে নতুন করে সাজাতে কেন্দ্র থেকে কঠোর নজরদারি ও নির্দেশনা বজায় রাখা হচ্ছে। অসম্পূর্ণ থাকা কমিটিগুলোকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে জাতীয় সম্মেলনের আগে দলটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে পারে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় সম্মেলন আয়োজনের লক্ষ্য থাকলেও অনুকূল পরিস্থিতি সাপেক্ষে তা আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর বিএনপি তাদের দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুরু থেকেই জাতীয় সম্মেলনের বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য মাঠ পর্যায়ের সংগঠনগুলোর সবল অবস্থান অপরিহার্য। তাই দল গঠন ও পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়াকে বিএনপি এখন তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। দলের সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ইতিমধ্যে ঘোষিত হলেও ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দলসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানিয়েছেন যে, একটি পরিপূর্ণ ও সফল জাতীয় সম্মেলন আয়োজনের পূর্বশর্ত হলো তৃণমূলকে সুসংগঠিত করা। সেই লক্ষ্যেই সারা দেশে অর্ধেক কমিটি গঠনের কাজ শেষ হয়েছে এবং বাকিগুলো দ্রুতই সম্পন্ন হবে। তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় চলছে। কোনো পর্যায়ের কমিটিই যেন স্থবির হয়ে না থাকে, সে বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত সচেতন। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে মাঠ পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমের গতি বেড়েছে, যা সামগ্রিক সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। দল গঠন ও পুনর্গঠনের কার্যক্রম কেবল সম্মেলনকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি দলকে জনমুখী ও শক্তিশালী করার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। তৃণমূলের কমিটি গঠনে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নিবিড় নজরদারি রয়েছে, যাতে দক্ষ, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে কমিটিগুলো গঠিত হয়। বিগত দিনে যারা দলের দুর্দিনে পাশে থেকেছেন, তাদের মূল্যায়ন করার বিষয়টিও এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তৃণমূলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও দলের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি ইউনিটকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে।
নেতাকর্মীদের মতে, সাংগঠনিক কার্যক্রম সব সময় উঁচু-নিচু ধারাবাহিকতায় চলমান থাকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তাল সময়ে দলের একতা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা মনে করছেন, সম্মেলন আয়োজনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি প্রয়োজন। দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, তা কাজে লাগিয়ে বিএনপি তাদের এই সাংগঠনিক কার্যক্রমকে চূড়ান্ত রূপ দিতে চায়। মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও এখন নতুন উদ্যম দেখা যাচ্ছে, যা সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের ভেতর এক ধরনের ইতিবাচক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।
সম্মেলন ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনাও চলছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। কারা নতুন কমিটিতে জায়গা পাবেন কিংবা নেতৃত্বের পরিবর্তনের প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে সরব আলোচনা রয়েছে। কেন্দ্র এসব আলোচনার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল সাংগঠনিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষা করাই এখন বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, বিএনপির এই সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলের দুঃসময়ে যারা মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন বা দলের আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তৃণমূলের কমিটিগুলোতে তাদের অগ্রাধিকার পাওয়ার বিষয়টি কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে। এটি কেবল পদ-পদবি পাওয়ার লড়াই নয়, বরং দলকে তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রয়াস। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যত দ্রুত শেষ হবে, জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন ততই বেগবান হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে একটি সুশৃঙ্খল দল গঠনই বর্তমানে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপি তাদের কার্যক্রমকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক না রেখে বরং দলের মূল কাঠামোকে শক্তিশালী করার দিকে ঝুঁকছে। এটি একটি সুস্থ ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারার পরিচয় বহন করে। দেশের প্রতিটি প্রান্তের নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করতে পারলে তা বিএনপির জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। সময়ের প্রয়োজনে দলের অভ্যন্তরে আধুনিকায়ন ও গণতান্ত্রিক চর্চার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বিএনপিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে দলের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন।
পরিশেষে বলা যায়, বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম এখন একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে। ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়া মানে হলো অর্ধেকের বেশি পথ পাড়ি দেওয়া। বাকি অর্ধেক কাজ কত দ্রুত ও নিপুণভাবে শেষ করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে জাতীয় সম্মেলনের সাফল্য। কর্মীদের আশা, কোনো অসম্পূর্ণতা ছাড়াই দলটি তাদের সম্মেলনের দিকে এগিয়ে যাবে। সব মতভেদ ভুলে সবাই যদি একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে, তবে বিএনপি নিশ্চিতভাবেই আরও বলিষ্ঠ সংগঠন হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারবে। চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত সেই সম্মেলনের প্রতীক্ষায় এখন সারা দেশের লাখো নেতাকর্মী।