প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও শৈল্পিক ফুটবলের দেশ ব্রাজিল আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের এই দৈন্যদশা কেবল মাঠে তাদের পারফরম্যান্সের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এর শিকড় লুকিয়ে আছে ফুটবলের প্রশাসনিক কাঠামোর গভীরে। কিংবদন্তি ফুটবল সম্রাট পেলের জ্যেষ্ঠ কন্যা কেলি ক্রিস্টিনা নাসিমেন্তো সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলের এই পতনের জন্য দেশটির ফুটবল প্রশাসনের অদূরদর্শিতা ও স্বচ্ছতার অভাবকে দায়ী করেছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ব্রাজিলের ফুটবল খেলোয়াড় তৈরির কারখানায় কোনো সমস্যা নেই, সমস্যাটি মূলত তাদের শাসনব্যবস্থায়।
ব্রাজিলের বর্তমান ফুটবলীয় অবস্থার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেলি নাসিমেন্তো বলেন, ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কার্যত একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দশকের পর দশক ধরে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির অভাব ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সোনালি ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি হোক বা অন্য যেকোনো নেতিবাচক কারণ, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোটি এমন একটি রুদ্ধদ্বার ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে যে বাইরের কেউ তার সঠিক চিত্র দেখতে পায় না। সবাই জানে কোথায় সমস্যাটি রয়েছে, কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের কার্যকর বা সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার মতো সদিচ্ছা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নেই।
সম্প্রতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে রাউন্ড অব সিক্সটিনে ২-১ গোলে হেরে সেলেসাওদের বিদায় নেওয়াটা ছিল এক বড় ধাক্কা। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম ব্রাজিল কোনো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলো। সর্বশেষ ২০০২ সালে রোনালদো নাজারিওর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের পর দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গেলেও ব্রাজিলিয়ানরা আর শিরোপার দেখা পায়নি। অথচ বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে আজও প্রতিভার কোনো অভাব নেই ব্রাজিলে। প্রতিটি অলিগলি থেকে আজও বিশ্বের সেরা সব ফুটবলার উঠে আসছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই প্রতিভাবান তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা এবং তাদের আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য তৈরি করার মতো কোনো কার্যকর ও পেশাদার ফুটবল কাঠামো ব্রাজিলে গড়ে ওঠেনি।
কেলির মতে, তার বাবা পেলে যখন জীবিত ছিলেন, তখন তিনিও ব্রাজিলের ফুটবলের এই ক্রমাগত অবনতির বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। পেলে সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো যেভাবে তাদের ফুটবল কাঠামোকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করে তুলেছে, ব্রাজিলকেও ঠিক সে পথেই এগোতে হবে। ফ্রান্সের ধারাবাহিক সাফল্যের রহস্য হলো তাদের পরিকল্পিত ও কার্যকর ফুটবল ব্যবস্থা। পেলে অনেকবারই আধুনিক ফুটবল প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু তার সেই আকুল আহ্বান আজও ব্রাজিলের ফুটবল নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
তবে সবকিছুর মধ্যেও কেলি নাসিমেন্তো ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের যে ঢেউ লেগেছে, সেটিকে তিনি আশাব্যঞ্জক মনে করেন। বিশেষ করে বোটাফোগো ক্লাবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০২২ সালে মার্কিন ব্যবসায়ী জন টেক্সটর ক্লাবটির মালিকানা গ্রহণ করার পর থেকে সেখানে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্লাব পরিচালনার ক্ষেত্রে টেক্সটর যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি আনার চেষ্টা করছেন, তা ব্রাজিলের ফুটবল প্রশাসনের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারী হওয়ার কারণে তাকে একটি নির্দিষ্ট আইনি ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হয়, যা ব্রাজিলের স্থানীয় প্রশাসকদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
ব্রাজিল ফুটবলে যে সংস্কারের ডাক আজ কেলি নাসিমেন্তো দিয়েছেন, তা নতুন কোনো বিষয় নয়। বছরের পর বছর ধরে ফুটবল প্রেমীরাও এমনটাই দাবি করে আসছেন। কিন্তু ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে ফুটবলের স্বার্থ। নাসিমেন্তোর এই মন্তব্য কেবল একজন পেলের মেয়ের আবেগী কথা নয়, এটি আজকের ব্রাজিলের ফুটবল বাস্তবতার এক কঠিন আয়না। যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই, সেখানে সাফল্য সাময়িকভাবে এলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা অসম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রাজিলের ফুটবলকে যদি আবার আগের মতো বিশ্বসেরার আসনে ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে কেবল মাঠে গোল করলেই চলবে না। মাঠের বাইরের এই গোলমেলে প্রশাসনিক জঞ্জাল দূর করতে হবে। স্বচ্ছ নির্বাচন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং আধুনিক ফুটবল ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ছাড়া সেলেসাওদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া কঠিন। কেলি নাসিমেন্তোর এই সংস্কারের ডাক আজ পুরো ব্রাজিলের ফুটবল ভক্তদের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব ফুটবল চায় ব্রাজিল আবার তার পুরনো রূপে ফিরুক, যেখানে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি মাঠের বাইরের ব্যবস্থাপনায়ও থাকবে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। যদি সময় থাকতে এই সংস্কার শুরু না হয়, তবে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাস হয়তো শুধু স্মৃতির পাতায়ই উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।