বস্ত্র খাতে নগদ সহায়তার হার ৫ শতাংশ করলো সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ বার
বস্ত্র খাতে নগদ সহায়তার হার ৫ শতাংশ করলো সরকার

প্রকাশ:  ১০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের প্রাণকেন্দ্র হলো বস্ত্র খাত, যা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই শিল্পের দীর্ঘদিনের সংকট ও ব্যবসায়ীদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে দেশীয় সুতা ও কাপড়ের ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তার হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই নতুন নির্দেশনা গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই সুবিধাটি চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা দেশীয় বস্ত্রকল মালিকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, নগদ সহায়তার হার কমিয়ে দেওয়ায় তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। গত আড়াই বছর আগে স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদান করা হতো। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা সংকুচিত করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা ৩ শতাংশ করা হয় এবং পরবর্তীতে তা আরও কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। সেই সাথে এই সহায়তার ওপর আবার ১০ শতাংশ কর আরোপ করার ফলে ব্যবসায়ীরা এক চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহার করা অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছিল।

এই সংকট নিরসনে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআর ভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেখানে তারা ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যার মধ্যে প্রধান ছিল নগদ সহায়তা ৫ শতাংশে উন্নীত করা। তারা যুক্তি দেখান যে, দেশীয় সুতা ব্যবহারের হার বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প আরও শক্তিশালী হবে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই দাবি নিয়ে দেনদরবার হয়েছিল, কিন্তু তখন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিটিএমএর নেতারা পুনরায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতি ও সবুজ সংকেতের পরই মূলত অর্থ মন্ত্রণালয় এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, রপ্তানিকারকদের এই নতুন প্রণোদনা গ্রহণের আগে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে দেশীয় উৎস থেকে সুতা বা কাপড় সংগ্রহের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। এটি নিশ্চিত করবে যে, সরকারি এই সহায়তা মূলত স্থানীয় শিল্পের বিকাশে ব্যয় হচ্ছে এবং বিদেশি সুতার ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বস্ত্র খাতের জন্য চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এটি সরকারের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যার উদ্দেশ্য হলো পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেন বাইরের কোনো উৎস ছাড়াই আমরা বিশ্বমানের পোশাক রপ্তানি করতে পারি।

এই খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদানের এই সিদ্ধান্ত দেশের টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলোর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে সুতা ও কাপড়ের মূল্যে তীব্র অস্থিরতা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার কর্তৃক বর্ধিত নগদ সহায়তা ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এটি কেবল ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধি করবে না, বরং স্থানীয় বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন নতুন বস্ত্রকল স্থাপনের পথ প্রশস্ত করবে। যারা এতদিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে পারেননি, তাদের জন্য এটি একটি বড় উদ্দীপনা।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে লাখো শ্রমিকের জীবন-জীবিকা। সুতা ও কাপড়ের কারখানাগুলো সচল থাকা মানে হলো এই বিশাল কর্মীবাহিনীর পরিবারের মুখে হাসি ফোটা। যখন ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়েন, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ শ্রমিকরা। নগদে সহায়তা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তে কারখানা মালিকদের যেমন আর্থিক স্বস্তি ফিরবে, তেমনি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও কারখানার আধুনিকায়নে গতি আসবে। দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে বস্ত্র খাতের এই পুনরুজ্জীবন বর্তমান সরকারের দূরদর্শী চিন্তা ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ।

পরিশেষে বলা যায়, ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সরকার পোশাকশিল্প ও বস্ত্রশিল্পের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছে। এর ফলে দেশীয় সুতা ব্যবহারের মাধ্যমে পোশাকশিল্পের মূল্যসংযোজন বা ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা ও আস্থা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের এই সাহসী উদ্যোগ বস্ত্র খাতকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে এবং রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সব ধরনের বাধা কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন নতুন উদ্যমে উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিতে পারবেন এবং আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্প এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত