প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক সভ্যতায় মুঠোফোন বা মোবাইল ফোন আমাদের নিত্যদিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এখনো দেশের অনেক দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, হাওর কিংবা বঙ্গোপসাগরের গভীর জলে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে মুঠোফোনের সিগন্যাল একটি বিলাসিতা। নেটওয়ার্কের অভাবে জরুরি প্রয়োজনে প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা বিপদের মুহূর্তে সাহায্যের আবেদন জানানো তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তবে প্রযুক্তির জয়যাত্রায় এই অন্ধকার দূর করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ডাইরেক্ট টু সেল বা ডিটুসি (Direct-to-Cell) নামের এক যুগান্তকারী প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন আর টাওয়ারের ওপর নির্ভর করতে হবে না, বরং সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমেই মুঠোফোনে যুক্ত হওয়া সম্ভব হবে।
ডিটুসি প্রযুক্তি মূলত একটি স্যাটেলাইট-ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা সাধারণ স্মার্টফোনের সঙ্গেই কাজ করে। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, এর জন্য কোনো স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ কোনো হার্ডওয়্যার বা ডিভাইসের প্রয়োজন নেই। ব্যবহারকারীর হাতে থাকা প্রচলিত ফোর-জি স্মার্টফোনটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যাটেলাইটের সিগন্যাল ধরতে পারবে। বর্তমানে এই সেবাটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে দেশের অন্যতম প্রধান মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক। তারা মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই সেবাটি দিচ্ছে। বিটিআরসির মতে, এখন পর্যন্ত এই প্রযুক্তির ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক।
প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত আমরা যখন কথা বলি বা বার্তা পাঠাই, তখন ফোনের সংকেত নিকটস্থ কোনো মোবাইল টাওয়ারে পৌঁছায়। কিন্তু দুর্গম এলাকায় যেখানে টাওয়ার নেই, সেখানে ডিটুসি প্রযুক্তি সংকেতটিকে সরাসরি মহাকাশে থাকা স্টারলিংকের স্যাটেলাইটে পাঠিয়ে দেয়। স্যাটেলাইট সেই সংকেত পুনরায় পৃথিবীতে থাকা গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায় এবং সেখান থেকে তা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। ফলে টাওয়ারের সীমানা বা ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এখানে আর কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বর্তমানে খুদে বার্তা পাঠানোর সুবিধা চালু থাকলেও, ভবিষ্যতে স্টারলিংকের নতুন প্রজন্মের স্যাটেলাইটগুলো পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হলে ভয়েস কল এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবাও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে প্রায় ১২ কোটি মানুষ এখন মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। দেশের দুর্গম এলাকায় টাওয়ার বসানো অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় না বলে মোবাইল অপারেটররা সেখানে বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহী হয় না। যার ফলে পাহাড়ি বা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষেরা প্রযুক্তিগত সুবিধাবঞ্চিত থেকে যায়। বাঘাইছড়ির সেই শিক্ষকের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই, যিনি হাজিরা খাতার ছবি পাঠানোর জন্য গাছের মগডালে উঠেছিলেন? ডিটুসি প্রযুক্তি সেই অভাবনীয় ডিজিটাল বৈষম্য ঘোচাতে এক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে গেছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফিলিপাইন সবচেয়ে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেখানে গ্লোব টেলিকম স্টারলিংকের সহযোগিতায় বাণিজ্যিকভাবে ডিটুসি সেবা চালু করেছে। ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময় সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়েছিল, তখন ডিটুসি প্রযুক্তিই দুর্গত এলাকায় জরুরি যোগাযোগ সচল রেখেছিল। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল ডিটুসি প্রযুক্তির সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে পরিণত হবে। বাংলাদেশও এখন সেই অগ্রযাত্রার শামিল হওয়ার পথে।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান জানিয়েছেন, স্টারলিংকের সঙ্গে পরিচালিত পরীক্ষামূলক কার্যক্রম থেকে তারা আশাব্যঞ্জক সাড়া পেয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু খুদে বার্তা আদান-প্রদান করা গেলেও পরবর্তী ধাপে ভয়েস ও ডেটা সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন টাওয়ারগুলো অকেজো হয়ে পড়ে, তখন ডিটুসি প্রযুক্তির এই স্যাটেলাইট সংযোগই হবে একমাত্র যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা ভূমিকম্পের মতো চরম পরিস্থিতিতে এটি জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে এক অনন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
তবে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রসারে কিছু আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও আইনি প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন বা আইটিইউর বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, মুঠোফোন সেবার জন্য বরাদ্দকৃত আইএমটি ব্যান্ড বা তরঙ্গ স্যাটেলাইট সেবার জন্য ব্যবহারের সুযোগ নেই। ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিও কনফারেন্সে এই সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, যেহেতু এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, তাই আইটিইউর দিকনির্দেশনা ছাড়া এটি বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণমাত্রায় চালুর ক্ষেত্রে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিটিআরসি বাংলালিংককে আপাতত শুধু পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক অনুমোদনের কোনো নিশ্চয়তা প্রদান করে না।
মানবিক দিক থেকে চিন্তা করলে, ডিটুসি প্রযুক্তির সাফল্য একটি দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের জেলে, গহীন অরণ্যের বাসিন্দা কিংবা দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরত মানুষেরা যখন বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত হবে, তখন তাদের জীবনযাত্রায় আসবে এক আমূল পরিবর্তন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি বিপদে তারা আর অবহেলিত থাকবে না। প্রযুক্তির মাধ্যমে সাম্য ও সংযোগ নিশ্চিত করার যে স্বপ্ন বাংলাদেশ সরকার দেখছে, ডিটুসি প্রযুক্তি হতে পারে সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণের প্রধান হাতিয়ার। পাহাড় থেকে সমুদ্র, আর শহর থেকে গ্রাম—আগামী দিনে প্রযুক্তির এই মহাসড়কে সবাই একীভূত হবে, এটিই এখন সময়ের দাবি।