প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ, নিরহংকার ও বাক্প্রতিবন্ধী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ববি বেগম। গত ২৫ বছর ধরে তিনি স্টেশনের প্রতিটি কোণ পরিষ্কার করে নিজের কাজের মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সেই কর্মমুখর মানুষটির জীবন প্রদীপ নিভে গেল একদল অমানবিক দুর্বৃত্তের জিঘাংসায়। জমানো সামান্য কিছু টাকার জন্য ববি বেগমকে যেভাবে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তা দেশের বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভৈরব রেলওয়ে থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ এবং র্যাব-১১-এর যৌথ অভিযানে ঢাকা, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ জুলাই গভীর রাতে। রাত আনুমানিক দুইটার দিকে মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে যখন ববি বেগম ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই একদল দুর্বৃত্ত সেখানে হানা দেয়। তারা কোনো রকম সহানুভূতি না দেখিয়ে ববি বেগমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করে। ববির বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তারা তাঁর কাছে থাকা দীর্ঘদিনের জমানো কষ্টের প্রায় ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। এই হামলায় ববি বেগমের চোখ, মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। কিন্তু হাসপাতালের পরিবেশে অস্বস্তিবোধ করায় এবং স্টেশনের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ থেকে তিনি দ্রুতই স্টেশনের সেই পরিত্যক্ত কক্ষে ফিরে আসেন।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, শারীরিক যন্ত্রণার ক্ষত ববি বেগমের শরীর বইতে পারছিল না। ৮ জুলাই রাতে তাঁর অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। তখন তাঁকে পুনরায় দ্রুত রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পথেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ববি বেগমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মেথিকান্দা স্টেশন এলাকা ও আশপাশের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এই নৃশংস ঘটনায় ৭ জুলাই মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার শাহীন মিয়া বাদী হয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ও র্যাবের সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতায় ৯ ও ১০ জুলাই ভোর পর্যন্ত টানা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজন হলেন সাকিব মিয়া, ইলিয়াছ হোসেন, বিল্লাল মিয়া, দ্বীন ইসলাম ও রিফাত মিয়া। ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদ আহমেদ জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। আজ শুক্রবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ববি বেগমের এই করুণ মৃত্যু আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। একজন অসহায় মানুষ, যিনি দিনের পর দিন স্টেশন পরিষ্কার করে আমাদের সেবার কাজ করেছেন, তাঁর শেষ পরিণতি এমন হবে—তা কল্পনা করাও কঠিন। ৮ জুলাই ময়নাতদন্ত শেষে যখন তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়, তখন স্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় হাজারো মানুষের উপস্থিতি ছিল তাঁর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং শত শত সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশ নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা এবং স্থানীয় থানার ওসি মজিবুর রহমান ববি বেগমের এমন অকাল মৃত্যুতে শোক জানিয়ে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি সাইদ আহমেদ ব্যক্তিগতভাবে ঘটনার পর মেথিকান্দা স্টেশন পরিদর্শন করেছিলেন এবং আহত ববি বেগমের সঙ্গে দেখা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন। তিনি জানান, পুলিশের তদন্ত এখনো চলমান। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত থাকবে। এই হত্যাকাণ্ডে কোনো প্রভাবশালী মহল বা অন্য কেউ জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো আসামিই পার পেয়ে যেতে না পারে।
ববি বেগমের এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সাধারণ ছিনতাই বা খুনের ঘটনা নয়, এটি আমাদের মানবিকতার পরাজয়। অসহায় মানুষ, বিশেষ করে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভিন্নভাবে সক্ষমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। অথচ আমরা দেখলাম, রেলস্টেশনের মতো একটি স্থানেও ববি বেগম নিরাপদ ছিলেন না। তাঁর সেই জমানো ২০ হাজার টাকা ছিল হয়তো তাঁর বেঁচে থাকার শেষ সম্বল, কিন্তু সেই টাকাও দুর্বৃত্তদের লোভের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি।
পরিশেষে বলা যায়, ববি বেগমের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এখন আদালতের দায়িত্ব। এই ঘটনার তদন্ত এমনভাবে সম্পন্ন করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো অসহায় কর্মজীবী মানুষের ওপর এমন পৈশাচিক হামলা চালানোর সাহস কেউ না পায়। প্রশাসনের এই তৎপরতা যেন কেবল গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে ববি বেগমের আত্মা শান্তি পায়। ববি বেগম হয়তো আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু তাঁর স্মৃতি ও কর্ম আমাদের মনে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াটাই এখন দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের প্রত্যাশা।