অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান রোধে নতুন নীতিতে সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান রোধে নতুন নীতিতে সরকার

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রসব নিরুৎসাহিত করতে সরকার নতুন নীতিমালা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সিজারিয়ান প্রসবের ওপর নির্ভরতা কমানোই নয়, উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পরিবার পরিকল্পনা পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, মিডওয়াইফ ও কেয়ারগিভার নিয়োগ, ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণসহ স্বাস্থ্যখাতে একগুচ্ছ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এবং লেগো ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্প্ল্যাশ’ প্রকল্পের উদ্বোধনী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী, চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রসবের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সিজারিয়ান জীবন রক্ষাকারী একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া এই পদ্ধতির ব্যবহার মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে সরকার প্রয়োজনভিত্তিক প্রসবসেবা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করছে।

তিনি জানান, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা হচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েরা যাতে নিজ নিজ উপজেলায় উন্নত চিকিৎসা পান এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্যত্র যেতে না হয়, সে জন্য স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, চলতি বছরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, পরীক্ষার মান উন্নয়ন এবং রোগীদের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। উপজেলা পর্যায়ে উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধা নিশ্চিত হলে জেলা বা রাজধানীকেন্দ্রিক চাপও অনেকাংশে কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রয়োজনীয় পরিবার পরিকল্পনা পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় দেশে কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণে কাজ করছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সব ধরনের পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে তিনি জানান।

গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে সরকার নতুন করে মিডওয়াইফারি ও কেয়ারগিভার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় হাসপাতালের বাইরে অনিরাপদ পরিবেশে প্রসব কিংবা দালালচক্রের প্রভাবে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের ঘটনা ঘটে। প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ ও কেয়ারগিভার নিয়োগের মাধ্যমে এসব সমস্যা কমিয়ে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, নবজাতকের জন্মের পরপরই মাতৃদুগ্ধ, বিশেষ করে শালদুধ গ্রহণ নিশ্চিত করা শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি বৃদ্ধি পেলে নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় এই সেবাও আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

নারীদের স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করতে সরকারের নতুন কর্মপরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে স্তন ক্যান্সার ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার শনাক্তকরণ কার্যক্রম বা স্ক্রিনিং শুরু করার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজ করতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। বর্তমানে অনেক রোগীকে ডায়ালাইসিসের জন্য জেলা শহর বা রাজধানীতে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। উপজেলা পর্যায়ে এই সুবিধা চালু হলে রোগীরা নিজ এলাকার কাছাকাছি থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রসবের হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া সিজারিয়ান প্রসব নিরুৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে নিরাপদ মাতৃত্ব, দক্ষ ধাত্রীসেবা এবং মানসম্মত প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা নিশ্চিত করার সুপারিশও রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন, হাসপাতালগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি, চিকিৎসকদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী হবে।

সরকারের ঘোষিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং কিডনি রোগের চিকিৎসা—সব মিলিয়ে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন এসব পরিকল্পনা কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই নজর স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত