সংসদের ‘ককাস অব আমেরিকা’ কেন আলোচনায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
সংসদের ‘ককাস অব আমেরিকা’ কেন আলোচনায়

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ‘ককাস অব আমেরিকা’ নামে একটি আন্তদলীয় সংসদীয় প্ল্যাটফর্মের অস্তিত্ব সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে জনআলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে গত ৪ জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। ওই অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলে সেখানে ‘ন্যাশনাল পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশের ককাস অব আমেরিকা’-কে ধন্যবাদ জানানো হয়। এরপর থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে—সংসদের ‘ককাস অব আমেরিকা’ কী, এর উদ্দেশ্য কী এবং এটি কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সংসদীয় বিশ্লেষকদের মতে, ‘ককাস’ কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত প্রতিষ্ঠান নয়। এটি মূলত একটি অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়, নীতি, অঞ্চল বা একটি দেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা একত্রিত হয়ে আলোচনা, মতবিনিময় এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের সংসদীয় ককাস দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে।

‘ককাস’ শব্দটির অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিন্ন আগ্রহ বা মত থাকা ব্যক্তিদের একটি সমন্বিত গোষ্ঠী। সংসদীয় পরিভাষায় এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সদস্যরা কোনো নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে কাজ করেন, গবেষণা করেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেন। এটি সংসদের স্থায়ী কমিটি নয় এবং এর কোনো আইনগত নির্বাহী ক্ষমতাও নেই। বরং এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতা ও সংলাপ বৃদ্ধির একটি অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংসদীয় ককাস বা অনুরূপ কাঠামোর সফল উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মকে ‘অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ’ নামে পরিচিত করা হয়, যেখানে হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডসের সদস্যরা অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক শতাধিক ককাস রয়েছে, যেগুলো কৃষি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ নানা বিষয়ে কাজ করে থাকে।

বাংলাদেশেও বিষয়ভিত্তিক সংসদীয় ককাস নতুন কোনো ধারণা নয়। অতীতের বিভিন্ন জাতীয় সংসদে নৃগোষ্ঠী, অভিবাসন ও উন্নয়ন, নারী, শিশু এবং অন্যান্য সামাজিক বিষয় নিয়ে সংসদীয় ককাস গঠন করা হয়েছিল। এসব প্ল্যাটফর্মে শুধু সংসদ সদস্য নন, অনেক ক্ষেত্রে গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত ছিলেন। ফলে সংসদীয় কার্যক্রমের বাইরে নীতিগত আলোচনা এবং জনসম্পৃক্ততা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে ককাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে গঠিত ‘ককাস অব আমেরিকা ইন ন্যাশনাল পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ওসমান ফারুক। প্রায় ১০ সদস্যের এই ককাসে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরাও রয়েছেন। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের অংশগ্রহণের কারণে এটিকে একটি আন্তদলীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৪ জুলাই অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে ককাসের চেয়ারম্যান ওসমান ফারুক ছাড়াও সদস্য মাহবুবুর রহমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, নওশাদ জমির, নিপুণ রায় চৌধুরী, সানজিদা ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম এবং মারদিয়া মমতাজ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিজেপির আন্দালিভ রহমান এবং এনসিপির আখতার হোসেনও এই ককাসের সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ককাসটির উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হলেও এর চেয়ারম্যান ওসমান ফারুক বলেছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক জোট বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্ব, যোগাযোগ এবং বোঝাপড়া আরও শক্তিশালী করা।

এদিকে সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে, সংসদীয় ককাসের ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং এটি অনেক গণতান্ত্রিক দেশে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, আন্তদলীয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গঠিত ককাস কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে ‘ককাস অব আমেরিকা’র নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন এমন একটি সংসদীয় ককাস স্বাভাবিকভাবেই জনআগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। যদিও ককাসের কোনো সরকারি বা সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই, তবুও এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে মতবিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ইতিবাচক সংলাপ তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ককাসের কার্যক্রম, লক্ষ্য এবং বাস্তব ভূমিকা আরও স্পষ্ট হলে এ নিয়ে জনমনে বিদ্যমান কৌতূহলেরও অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে আন্তদলীয় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে সংসদীয় ককাস কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত