প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর যানজট, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা চালুর পর এবার তুলনামূলক কম খরচে অধিক এলাকায় নজরদারি নিশ্চিত করতে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ প্রযুক্তির নতুন ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে জনবলনির্ভর ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, রাজধানীর দ্রুত বর্ধনশীল যানবাহন, প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত নগর বাস্তবতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত এআই ক্যামেরাগুলো কার্যকর হলেও সেগুলোর স্থাপন ও পরিচালনায় ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে অল্প সময়ে শহরের সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই প্রযুক্তি বিস্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলতেই ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন এই প্রযুক্তি তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হলেও ট্রাফিক নজরদারিতে প্রয়োজনীয় কার্যকারিতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। তাঁর ভাষ্য, রাজধানীর আরও বিস্তৃত এলাকায় দ্রুত নজরদারি নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা আশাবাদী।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিই সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। সেই বিবেচনায় ডিএমপি এখন কেবল প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে না; বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার নতুন মডেল গড়ে তুলতে কাজ করছে। ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ প্রযুক্তির ক্যামেরাগুলো দ্রুত স্থাপনযোগ্য হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় কিংবা দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সহজেই ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এআই ক্যামেরা চালুর পর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। অনেক চালক ট্রাফিক আইন মেনে চলতে শুরু করেছেন, সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা কমেছে এবং নগরবাসীর মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে বলেও মনে করছে ট্রাফিক বিভাগ।
আনিছুর রহমান বলেন, রাজধানীর মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ট্রাফিক আইন অনুসরণ করছেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র শাস্তির ভয় নয়, বরং প্রযুক্তির উপস্থিতি নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মিশ্র যানবাহনের চলাচল। একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ জটিল হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধি, যা নগর পরিবহনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শহরের ধারণক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ট্রাফিক বিভাগের মতে, রাজধানীতে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আনফিট যানবাহন চলাচল করছে। পাশাপাশি উন্নত, নির্ভরযোগ্য এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, শুধু প্রযুক্তি বা আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পথচারীদের আচরণগত পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীর অনেক এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর করা হলেও অনেক পথচারী নির্ধারিত সময় অপেক্ষা না করে যত্রতত্র রাস্তা পারাপার করেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।
তিনি বলেন, বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সফলতা অনেকাংশেই নাগরিকদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। চালক, পথচারী, পরিবহন মালিক এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা—সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীর কোথায়, কখন এবং কী ধরনের যানজট সৃষ্টি হয়, সে বিষয়ে তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্যভান্ডার রয়েছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেই বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক সদস্য মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টা ট্রাফিক সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়, কারণ এসব স্থানে সার্বক্ষণিক যানবাহনের চাপ থাকে।
তবে ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ ও যানবাহনের চাপ বিবেচনায় শুধু জনবলনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণেই প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকে এগোচ্ছে ডিএমপি। নতুন ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে দ্রুত নজরদারি সম্প্রসারণ, আইন লঙ্ঘনের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ এবং তথ্যভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর যানজট নিরসনে প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হলেও এর পাশাপাশি উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ সমানভাবে প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।