প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে পাহাড় কাটা, পরিবেশ ধ্বংস এবং দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করে তোলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, অতীতের মতো আর নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলবে না। প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন, পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কোথাও স্লুইসগেট বন্ধ রেখে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করা হয়ে থাকলে, সেসব ঘটনাও তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) কক্সবাজার সফরে প্রতিমন্ত্রী জেলার বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন এবং সরকারি সহায়তা কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেন। পরিদর্শন শেষে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দের পাড়ায় শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি।
ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাহাড় ধ্বংসের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে দেশের পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে রয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যার ফল হিসেবে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার পরিবেশ রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না। যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শুধু ত্রাণ বিতরণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। পাহাড় কাটা বন্ধ, জলাবদ্ধতা নিরসন, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে কোথাও কোথাও স্লুইসগেট বন্ধ রেখে কৃত্রিমভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি কিংবা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্দেশে বলেন, দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে সরকার তাদের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। জনগণের আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নির্বাচিত সরকারের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়ক, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, কৃষিজমি, মৎস্য খামার, গবাদিপশু এবং অসংখ্য বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। বন্যার পানি সম্পূর্ণ নেমে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুনর্বাসন, অবকাঠামো সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, সরকার শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষিকাজে ফিরিয়ে আনা, মৎস্যচাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সহায়তা দেওয়া, গবাদিপশু হারানো পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষা কার্যক্রম যাতে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, সে লক্ষ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার কাজও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারসহ দেশের পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হওয়ায় ভারী বর্ষণে মাটি ধসে পড়ে এবং এতে প্রাণহানির পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না, ফলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতি।
সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন, আবার অনেকেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অসংখ্য কৃষক। মাছের ঘের, পুকুর এবং গবাদিপশুরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবৈধ বসতি নিয়ন্ত্রণ, পাহাড় সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার সফরকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড রোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সুগম হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।