নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গঠনের অঙ্গীকার ভারতের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ২৪ বার
নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গঠনের অঙ্গীকার ভারতের

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির নতুন বাস্তবতার মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক প্রচার অভিযান শুরু করেছে ভারত। এই উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রমণিয়ম জয়শঙ্কর বলেছেন, ভারত একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় দেশটি কাজ করবে, যেখানে উন্নয়নশীল বিশ্বের, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পাবে এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার হবে।

সোমবার (১৩ জুলাই) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রচার কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এ বক্তব্য দেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২০২৮-২০২৯ মেয়াদের অস্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারত তার প্রার্থিতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করেছে। প্রচার অভিযানের সূচনায় জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যবস্থা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একযোগে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জয়শঙ্কর বলেন, ভারত বিশ্বাস করে যে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সব দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

তিনি বিশেষভাবে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতামত দীর্ঘদিন ধরেই পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ভারত সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করবে। তার ভাষায়, একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্বব্যবস্থা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের দেশগুলোর কণ্ঠস্বরও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে সমান গুরুত্ব পাবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ভারতের অবদান দীর্ঘদিনের এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তিনি জানান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন চালু হওয়ার পর থেকে ভারত প্রায় ৫০টি মিশনে তিন লাখের কাছাকাছি সেনা ও শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত ১০টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে চার হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ভারতীয় সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের পেশাদারিত্ব, মানবিক ভূমিকা এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের কথা উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, এই অভিজ্ঞতা নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করবে।

ভারত নির্বাচিত হলে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে দুই বছরের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এর আগে দেশটি আটবার নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০২১-২০২২ মেয়াদে ভারত এই দায়িত্ব পালন করে। সে সময় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার মতো বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল বলে ভারতীয় কূটনৈতিক মহল উল্লেখ করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ অর্জনের প্রচারণা শুধু একটি নির্বাচনী উদ্যোগ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক কূটনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এবং জি-২০, ব্রিকস ও কোয়াডের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোটে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভারত নিজেকে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংস্কারের দাবি রয়েছে। ভারত, জাপান, জার্মানি ও ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরে পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছে। ভারতের অবস্থান হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় গঠিত বর্তমান কাঠামো বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং পরিষদকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

জাতিসংঘে প্রচার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, তাদের আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধ, সুদানের মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটগুলো মোকাবিলায় জাতিসংঘের নেতৃত্ব ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিষদের কার্যক্রমকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এসব ইস্যুতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে দেশটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সংলাপ বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বানও জানিয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলে ভারত বৈশ্বিক শান্তি, সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে গ্লোবাল সাউথকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও এর অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনী প্রচারণায় এই কৌশল ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আগামী মাসগুলোতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখবে নয়াদিল্লি। এ প্রচারণার মাধ্যমে ভারত শুধু নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ অর্জনই নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গঠনে নিজের নেতৃত্বের অবস্থানও আরও সুদৃঢ় করতে চায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত