পোশাক রপ্তানিতে টানা পঞ্চমবার বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
পোশাক রপ্তানিতে টানা পঞ্চমবার বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও টানা পঞ্চমবারের মতো দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ঘিরে উদ্বেগের মধ্যেও দেশের পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে তার শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে একই সঙ্গে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বা মার্কেট শেয়ার ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রথম স্থানে রয়েছে চীন, আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে ভিয়েতনামের রপ্তানি ছিল ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান এখন মাত্র প্রায় ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এ নিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখার কৃতিত্ব অর্জন করল বাংলাদেশ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় ভিয়েতনাম সাময়িকভাবে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে গেলেও ২০২১ সালে বাংলাদেশ আবার সেই অবস্থান পুনরুদ্ধার করে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে দেশটি। তবে সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ভিয়েতনামের দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২০২৫ সাল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সহজ ছিল না। বছরের বেশিরভাগ সময় শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সময়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়ায়। এসব কারণে দেশের অন্তত ১৪১টি পোশাক কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা নতুন রপ্তানি আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা, যেখানে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর একাধিকবার শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন করা হয়।

এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই সীমিত। ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। ডলারের অঙ্কে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৩৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। দেশটির রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের তুলনায় বহু গুণ বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের শেষে ভিয়েতনাম আবারও বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে। কারণ উৎপাদন দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার বৈচিত্র্যে ভিয়েতনাম ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করছে।

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ২০২৫ সালে কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছর এই হার ছিল ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ছিল ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অর্থাৎ টানা দুই বছর ধরে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের শেয়ার কমছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের বাজার অংশীদারিত্ব ২০২৩ সালের ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দুই দেশের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীনের আধিপত্য এখনও বজায় থাকলেও তাদের বাজার অংশীদারিত্বও কমছে। ২০২৫ সালে চীনের বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৩০ দশমিক ০৫ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির পোশাক রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমে ১৫৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে চীনের রপ্তানি আয় কমেছে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

বিশ্ববাজারে চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতের অংশীদারিত্ব সামান্য বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে পঞ্চম অবস্থানে থাকা তুরস্কের অংশীদারিত্ব কমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্বও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই আরও বহুমুখী হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, দেশের পোশাক শিল্প এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে জ্বালানি সংকট ছাড়া বড় ধরনের কোনো কাঠামোগত সমস্যা নেই। তিনি বলেন, ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি)–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন রপ্তানি আদেশ ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে আগামী এক বছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে শুধু অবস্থান ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়; বৈশ্বিক বাজারে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিনের আস্থা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রয়েছে, অন্যদিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ভিয়েতনামসহ নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীরা। ফলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব কারখানায় বিনিয়োগ, ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্য সংযোজনমূলক পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ শুধু দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখাই নয়, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

ডব্লিউটিওর সর্বশেষ পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি সাফল্যের বার্তা বহন করছে, তেমনি ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্রুত সংস্কার, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত