প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ ৪৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় যেন আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করা মহানায়ক জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় অন্যতম অভিযুক্ত এবং সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে বিশেষ নিরাপত্তাবলয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে ঢাকা সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়েছে। রবিবার গভীর রাতে কঠোর সামরিক প্রহরায় মিলিটারি পুলিশ এবং আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের তত্ত্বাবধানে তাকে আকাশপথে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনার নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের শনাক্ত করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পলাতক থাকা মোজাফফর হোসেনকে সম্প্রতি ঢাকার বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তাকে সেনা হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্ত এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে জানা গেছে, মোজাফফর হোসেন কেবল একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীই নন, বরং হত্যাকাণ্ডের পেছনের গভীর ষড়যন্ত্রের অনেক অজানা তথ্যের ভাণ্ডার তার কাছে সংরক্ষিত আছে। তাকে ঢাকা সেনানিবাসে স্থানান্তরের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে। তবে এই জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা আসেনি। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি এবং এসবিসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইতিহাসের পাতায় জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ একজন রাষ্ট্রনায়ককে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। সেদিনের সেই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দেশি-বিদেশি শক্তির যে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল, তা আজও রহস্যে ঘেরা। মোজাফফর হোসেনের মতো ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং দেশীয় মাস্টারমাইন্ডদের মুখোস উন্মোচিত হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর তাকে আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে ইতিহাসের দায়মোচনের একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই সব কুশীলবদের পরিচয় জানার জন্য, যারা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে রাষ্ট্রনায়ককে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।
মোজাফফর হোসেনের কর্মজীবন ও পলাতক জীবনের ইতিহাস অত্যন্ত রহস্যময়। স্বাধীনতার পর তিনি জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে কমিশন পেয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বাহিনীটি বিলুপ্ত হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৮১ সালে তিনি ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত থাকাকালীন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে তিনি অত্যন্ত সুচতুরভাবে ভারত পালিয়ে যান। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ দীর্ঘদিন ধরে তাকে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় আত্মগোপনে ছিলেন এবং সে সময় ‘বিপ্লব সরকার’ কিংবা ‘জয় ব্যানার্জি’র মতো ছদ্মনাম ব্যবহার করে নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ১৯৯৬ সালে তিনি গোপনে দেশে ফিরে আসেন এবং দীর্ঘসময় ধরে ফ্যাসিবাদী সরকারের ছত্রছায়ায় কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই স্বাভাবিক জীবন যাপন করে আসছিলেন। তবে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কললিস্টের সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার তাকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সামরিক আদালতে নেওয়া হয়েছিল। যেহেতু হত্যাকাণ্ডটি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের বিপথগামী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল এবং তৎকালীন সময়ে সেখানেই বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল, তাই আইনি নিয়ম ও আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতেই তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এবং জিজ্ঞাসাবাদের গভীরতা বাড়াতে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মোজাফফর হোসেনকে কেন্দ্র করে এখন সরকারের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদলের কারণে অনেক তথ্যই অস্পষ্ট থেকে গেছে। এখন তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডদের নাম বের করে আনা এবং দেশের মানুষের সামনে ইতিহাসের সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা হবে এই তদন্তের মূল লক্ষ্য।
অনেকেই মনে করছেন, মোজাফফর হোসেনের স্বীকারোক্তি কেবল সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করবে না, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়কে স্পষ্ট করবে। যারা নেপথ্যে থেকে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক এজেন্ডাগুলোও হয়তো এবার প্রকাশ্যে আসবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পেছনে কাদের হাত ছিল, তা জানার অধিকার এ দেশের সাধারণ মানুষের আছে। একজন সেনা কর্মকর্তা হয়েও কীভাবে তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর আত্মগোপনে থেকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করেছিলেন এবং কাদের সহযোগিতায় দেশে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছিলেন, তাও তদন্তের আওতায় থাকা জরুরি। মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার ইতিহাসের এমন অনেক অজানা প্রশ্নের জবাব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, জাতি এখন সেই তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। জিয়াউর রহমানের মতো একজন রাষ্ট্রনায়কের রক্ত কখনোই বৃথা যেতে পারে না। ইতিহাসের পাতায় যারা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা এঁকেছিল, তাদের পরিচয় উন্মোচন করা বর্তমান প্রজন্মের জন্য সময়ের দাবি। মোজাফফর হোসেনের ঢাকা সেনানিবাসে স্থানান্তর এবং জিজ্ঞাসাবাদের শুরু হতে যাওয়া এই প্রক্রিয়াটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবরা যদি শাস্তি পায়, তবেই ইতিহাসের কলঙ্ক কিছুটা হলেও মোচন হবে। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র এবং প্রশাসন তাদের এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে বলেই দেশবাসীর প্রত্যাশা।